
রফিকুল্লাহ চৌধুরী মানিক হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ):
ময়মনসিংহ জেলার সীমন্তবর্তী হালুয়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে উন্নত জাতের সরিষা চাষ হয়েছে। বিশাল ফসলের মাঠজুড়ে রয়েছে যেন হলুদের গালিচা! বেড়ে ওঠা গাছ আর ফুল দেখে অধিক ফলনের স্বপ্ন বুনছেন সরিষা চাষিরা। গত বছর স্থানীয় বাজারে উন্নত জাতের সরিষার চাহিদা ও দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা এবার সরিষা চাষে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠেছে পাশাপাশি ব্যস্ততা বেড়েছে মৌ চাষিদের মধু সংগ্রহে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে প্রত্যেক সরিষা চাষি অধিক লাভবান হবেন বলে মনে করছেন কৃষি বিভাগ।
হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় চলতি মৌসুমে সরিষার লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে কিন্তু আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে। ভবিষ্যতে সরিষার আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অচিরেই ভোজ্য তেল আমদানি করা বাদেই সরিষা থেকে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।
এমনকি এ উপজেলার ভোজ্য তেলের চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলাতে রফতানি করা সম্ভব হবে। এছাড়াও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১৪০ মেট্রিক টন। সিংহভাগই কৃষকরা জমিতে উচ্চ ফলনশীল বারি সরিষা-১৪,বারি সরিষা-১৭, বিনা সরিষা -৯ জাতের সরিষা চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমের শুরুতে উপজেলা কৃষি বিভাগ অধিক ফলনশীল বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৭, বিনা সরিষা -৯ জাতের সরিষা চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে। এ তিনটি জাতের সরিষা মাত্র ৮০-৮৫ দিনে ঘরে তোলা যায়। প্রতি হেক্টরে বারি সরিষা-১৪ জাত ১.৪১৬ টন বারি সরিষা-১৭জাত ১.৪৪১, টন বিনা সরিষা -৯ জাতের ফলন হয় ১.৪৫১ টন। সরিষা কেটে ওই জমিতে আবার বোরো আবাদ করা যায়।
উপজেলার ধারা ইউনিয়নের টিকুরিয়া গ্রামের চাষি শামসুল আলম খান ফয়সাল এর সাথে কথা বলে জানা যায়, সরিষা লাভজনক একটি ফসল। সরিষা চাষে আর্থিক খরচ ও শ্রম দু’টিই কম লাগে। তাছাড়া গত বছর সরিষার ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকরা এবার ব্যাপকভাবে সরিষা চাষ করেছেন। সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, উপজেলার স্বদেশী , আমতৈল ও শাকুয়াই ইউনিয়নের ফসলের মাঠগুলো সরিষা ফুলের হলুদ রঙে অপরূপ শোভা ধারণ করেছে। এটা দেখে মনে হচ্ছে যেন হলুদের গালিচা বিছানো রয়েছে।
কোন কোন জমিতে তাজা সরিষা ফুল, কোন জমিতে ফুল ঝরতে শুরু করেছে, কোন জমির গাছগুলোতে আবার সরিষার দানা বাঁধতে শুরু করেছে। প্রতিটি জমিতেই তরতাজা সবুজ সরিষা গাছগুলোতে হলুদ ফুলে ফুলে ভরে ওঠায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটতে শুরু করেছে। আমতৈল ইউনিয়নের চাষি নজরুল ইসলাম পারভেজ বলেন, এ বছর ৩৫ শতাংশ জমিতে বারি সরিষা-১৪ জাতের সরিষার আবাদ করেছি। আমার সব মিলিয়ে ৩-৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি ফলন ভালো হবে। শুরু থেকেই কৃষি অফিস নানা উপকরণসহ পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছে। উপজেলার নাশুল্লা গ্রামের চাষি সায়েদুল ইসলাম জানান, আমি প্রতি বছরই সরিষা চাষ করি, কারণ সরিষা থেকে যে তৈল পায় তা নিজের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে থাকি। আর সরিষা হলো লাভজনক ফসল।
এতে আর্থিক খরচ ও শ্রম কম লাগে। উপজেলার শাকুয়াই গ্রামের কৃষক সুভাষ ঘোষ বলেন, গত বছর বৃষ্টিপাতের কারণে সরিষার ফলন কম হয়েছিলো কিন্তু বাজারে দাম ভালো পাওয়ায় তা পুষিয়ে গেছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সরিষা উৎপাদন করে যথেষ্ট লাভবান হতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।
এ ব্যাপারে হালুয়াঘাট উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা হাবিবুর রহমান জানান, প্রতি বছর ভোজ্যতেল আমদানির পেছনে যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় তা কমিয়ে আনতে কৃষকদের সরিষার আবাদ বৃদ্ধির জন্য প্রতিনিয়ত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। উন্নতজাতের সরিষা চাষে কৃষকদের মাঝে প্রণোদনার মাধ্যমে উপকরণ সহায়তাসহ নানা পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া তেল জাতীয় প্রকল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের প্রদর্শনী দেয়া হচ্ছে ফলে কৃষকরা সরিষা চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা মোট ১১ হাজার ৫’শত জন কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে সরিষার বীজ ও সার প্রদান করেছি। এবিষয়ে হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান জানান, এ জমিতে শুধু সরিষায় নয় কীভাবে বোরো ও আমন ধান চাষের জন্য কি জাত ব্যবহার করা যায়, পাশাপাশি অন্যান্য ফসলও চাষাবাদ করা যায় সে বিষয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে আসছে। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে সরিষার আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অচিরেই ভোজ্য তেল আমদানি করা বাদেই সরিষা থেকে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।
আপনার মতামত লিখুন :