–মোঃ মাসুদ মিয়া
বাংলার কৃষক এই দেশের মাটি, মানুষ ও অর্থনীতির প্রাণ। প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা কাদামাটি সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে তিনি মাঠে ফসল ফলান, দেশের মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করেন। কৃষকের ঘামে ভেজা প্রতিটি ধানের শীষে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং একটি জাতির খাদ্যনিরাপত্তা। অথচ নির্মম বাস্তবতা হলো, যে কৃষক দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেন, তিনিই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের শিকার।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান উল্লেখযোগ্য, আর খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তিও এই কৃষি।কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদন করে না; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে, শিল্পখাতের কাঁচামাল জোগান দেয় এবং কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। স্বাধীনতার পর যে বাংলাদেশ খাদ্য সংকটে জর্জরিত ছিল, সেই বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়েছে মূলত কৃষকের শ্রম ও ত্যাগের কারণে। এই কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো দেশের হাওরাঞ্চল। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশাল জলাভূমি হাওর শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি দেশের খাদ্যভাণ্ডার। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি আর শুষ্ক মৌসুমে সোনালি ধানের ক্ষেত- এই দ্বৈত রূপই হাওরের বৈশিষ্ট্য। হাওর শুধু ধান উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; মাছ, হাঁস পালন, জলজ সম্পদ ও মৌসুমি শ্রমবাজারেরও অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু এই হাওরাঞ্চলই প্রতিবছর প্রকৃতির সবচেয়ে নির্মম আঘাতের শিকার হয়।অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল, কালবৈশাখী, শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত এখানকার কৃষকের জীবনে স্থায়ী আতঙ্ক। এবারের পরিস্থিতি যেন সেই দুর্ভোগকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং অকাল বন্যা আবারও দেশের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যে ধানের শীষে কৃষক সোনালি স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ফসল আজ বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাচ্ছে। চোখের সামনে বছরের পর বছর কষ্টে ফলানো ফসল ডুবে যেতে দেখে কৃষকের বুকের ভেতর জমছে হতাশা, অনিশ্চয়তা আর বেদনা। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাওরের বহু এলাকার ধান এখনও পুরোপুরি ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। কোথাও ১০ থেকে ১৫ ফুট পানির নিচে চলে গেছে পাকা ধান। অনেক কৃষক ধান কাটতে পারলেও মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ করতে পারছেন না। রোদের অভাবে কাটা ধান পচে যাচ্ছে। আবার কোথাও জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন নামানো যাচ্ছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ শ্রমিক সংকট। আগে ধান কাটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার শ্রমিক হাওরে আসতেন।কিন্তু এখন শিল্পকারখানা ও শহরমুখী কর্মসংস্থানের কারণে কৃষিশ্রমিকের সংকট তীব্র হয়েছে। ফলে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, আর পেলেও তাদের মজুরি সাধারণ কৃষকের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। কোথাও কোথাও একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু শ্রমিক সংকটই নয়, কৃষকের আরেক বড় দুর্ভোগ জ্বালানি সংকট। সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কথা বললেও বাস্তবে অনেক হারভেস্টার ডিজেলের অভাবে অচল হয়ে আছে। আবার কাদাময় জমিতে মেশিন নামানোও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষক পড়েছেন এক ভয়াবহ ত্রিমুখী সংকটে- প্রকৃতির দুর্যোগ, শ্রমিক সংকট এবং যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা।
বাংলাদেশে কৃষির আরেকটি বড় সমস্যা হলো দুর্বল সংগ্রহোত্তর বা পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা। মাঠ থেকে ফসল কাটার পর সঠিকভাবে শুকানো, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। হাওরাঞ্চলে এই সংকট আরও প্রকট। পর্যাপ্ত শুকানোর স্থান নেই, আধুনিক গুদাম নেই, কোল্ড স্টোরেজ সীমিত, যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল। ফলে কাটা ধানও নিরাপদে ঘরে তোলা যায় না। কৃষকের কষ্ট যেন মাঠ থেকে গোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে। সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ঋণ করে চাষাবাদ করেন কেউ এনজিও থেকে, কেউ দাদন ব্যবসায়ী বা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা এনে জমিতে বীজ ফেলেন। ফসল নষ্ট হলে সেই ঋণের বোঝা তাদের জীবনকে আরও অসহনীয় করে তোলে। অনেকে গবাদিপশু বিক্রি করে দেন, কেউ আবার সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেও হিমশিম খান। কৃষকের এই বেদনা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি গভীর মানবিক সংকটও।জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে আগে যে সময়ে বৃষ্টি হতো, এখন সেই সময়ের হিসাব পাল্টে গেছে। পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার প্রকোপও বেড়েছে। ফলে কৃষি পরিকল্পনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরের জন্য এখনই জলবায়ু সহনশীল, স্বল্পমেয়াদি ও বন্যা সহিষ্ণু ধানের জাত সম্প্রসারণ করা জরুরি। এমন জাত প্রয়োজন, যা দ্রুত পাকে এবং পানির নিচে থাকলেও ক্ষতি কম হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে আর্থিক সহায়তা, চাল বিতরণ, নগদ অনুদান, ধান কাটার যন্ত্র সরবরাহ এবং ডিজেল সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস বিশেষ সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী হাওরাঞ্চল পরিদর্শন করেছেন এবং ফসল রক্ষা বাঁধে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কৃষকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সরকার নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ০৩রা মে থেকে হাওর অঞ্চলে বোরো মৌসুমের ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করেছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো- প্রতিবছর একই ধরনের দুর্যোগ ও সংকট ফিরে আসছে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা দিয়ে সমস্যার সমাধান পুরোপুরি সম্ভব নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা।
প্রথমত, হাওরাঞ্চলে টেকসই ও পরিকল্পিত ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি বছর নিম্নমানের কাজ ও দুর্নীতির কারণে বাঁধ ভেঙে কৃষকের স্বপ্ন তলিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে বাস্তবমুখী করতে হবে। হাওরের উপযোগী কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও শুকানোর প্রযুক্তি সহজলভ্য করতে হবে। তৃতীয়ত, পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় আধুনিক গুদাম, শুকানোর প্ল্যাটফর্ম, কোল্ড স্টোরেজ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও কৃষকদের জন্য আবহাওয়া পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। কৃষি বীমা চালু করা গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক কিছুটা হলেও সুরক্ষা পাবেন। পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম আরও বাড়াতে হবে। হাওরের কৃষকের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বজ্রপাত, সাপের কামড়, জলাবদ্ধতা ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কৃষকের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাই হাওরে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, হাওরের কৃষক শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, পুরো দেশের মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য লড়াই করেন তাঁর ঘামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং গ্রামীণ জীবনের স্থিতিশীলতা। তাই কৃষকের দুর্ভোগকে শুধু মৌসুমি সংবাদ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জাতীয় সংকট হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আজ প্রয়োজন কৃষকের প্রতি আন্তরিকতা, কার্যকর পরিকল্পনা এবং বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। হাওরের কৃষকদের রক্ষা করা মানে দেশের খাদ্যভাণ্ডার ও অর্থনীতিকে রক্ষা করা। রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে এমন একটি কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কৃষক নিরাপদ থাকবে, ফসল নিরাপদ থাকবে এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হবে আরও শক্তিশালী। “হাওরের কৃষক বাঁচলে বাঁচবে হাওর, বাঁচবে কৃষি, বাঁচবে দেশ”- এটাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।
লেখকঃ বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ
আপনার মতামত লিখুন :