Agaminews
Dr. Neem Hakim

উপসম্পাদকীয় প্রাত্যহিক (৪র্থ পর্ব)


audhamyabangla প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৫, ১:৩৭ অপরাহ্ণ / ৮৬৬
উপসম্পাদকীয় প্রাত্যহিক (৪র্থ পর্ব)

ড. গোপাল চন্দ্র সরদার

জলিল সাহেব আর জামাল ব্যাপারী এখন ময়মনসিংহে। এখানকার ফুলবাড়ীয়ায় হুমগুটি খেলা দেখাই উদ্দেশ্য। আজই লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে হবে এই খেলা। এই খেলা দেখার জন্য গতকাল রাত আটটায় সাতক্ষীরা থেকে ছেড়ে আসা শামীম পরিবহনের দূরপাল্লার কোচে চড়ে ময়মনসিংহে আসেন তারা। রাস্তায় কয়েক জায়গায় দপুরের খাবার খাওয়াসহ কয়েকরকমের বিরতি দিয়ে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছায় বাসটি। সকাল ৬ টায় টাউনহল মোড়ে নেমে সোজা গিয়ে ওঠেন জামাল ব্যাপারীর খালাতো দুলা ভাই তামীমুলের বাতিরঘরের ভাড়া বাসায়। বাসায় ঢুকেই জামাল ব্যাপারী তার বোনের হাতেই দিলেন সাতক্ষীরা থেকে নিয়ে আসা ঘোষ ডেয়ারির মিষ্টির প্যাকেটটি। হাতে মিষ্টির প্যাকেট নিতে নিতে বোন সোহানা বললেন,’এসবের আবার কি দরকার ছিল ভাইজান’?বোনের কথা মুখে থাকতেই জামাল ব্যাপারী বললেন,’মিষ্টি তো তোদের জন্য আনিনি, মিষ্টি এনেছি আমার ভাগ্নি তুরিণের জন্য ‘। খালাতো ভাইয়ের জবাব শুনে সোহানা এক গাল হাসি দিয়ে ড্রইংরুম ছেড়ে চলে যাবার সময় বলেন,’ভাইজান, তোমরা একটু বস, আমি এখনই আসছি’।
কিছুক্ষণ বাদে সোহানা তার স্বামীকে নিয়ে ড্রইংরুমে ফিরে আসেন। মুখে বলেন, তুরিণ এখনো ঘুম থেকে উঠিনি।তামীমুল-সোহানা দম্পতির গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার জয়নগরে। গ্রামটি খুবই চমৎকার। এই গ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি লিখতে গেলে আকার, একার, রোস্সিকার, রোসসুকার, দীর্ঘুকার কিছুই লাগে না। এজন্য তামিমুল সুযোগ পেলেই মজা করা যায় এমন লোকজনকে বলেন, ‘ বলেন তো কোন্ গ্রামের নাম লিখতে গেলে আকার, ইকার, রোসসিকার, দীর্ঘুকার কিছুই লাগে না’। তামীমুলের এমন প্রশ্নে বেশিরভাগই হকচকিয়ে যায়, উত্তর দিতে গিয়ে চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ে। গ্রামের পাস দিয়ে বয়ে গেছে বেত্রাবতী নদী। একসময় নদীটার স্রোতে বেগ ছিল অনেক বেশি, তাই এর নাম বেত্রাবতী। নদীর তীরে বড় একটি বাজার। বাজারে আছে বহু পুরাতন আমলের একটি বটগাছ। এই বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছু পাওয়া যায়। বাজারের উত্তর পাশে হাইস্কুল, দক্ষিণ পাশে সরকারি প্রাইমারী স্কুল। এখানে কোন কলেজ না থাকলেও একটি দাখিল মাদ্রাসা আছে। তামীমুল গ্রামে অবস্থিত দুইটি স্কুলেই পড়েছে। হাইস্কুলের মাজেদ স্যারের কথা তার খুব মনে পড়ে। কোন ছাত্র একদিন স্কুুলে না আসলে মাজেদ স্যার চলে যেতেন তার বাড়ি। এতসব স্মৃতিতে ভরা সেই গ্রামের কথা তামীমুলের খুব মনে পড়ে। গ্রামের স্কুল, কলেজ, মাঠ, রাস্তা, পরিচিত মানুষ সবই এখন স্মৃতি। সোহানার পাশে বসে তামিমুল আরও বলছিল,’ তার মনে পড়ে সহপাঠী জবেদের কথা। ক্লাস ফোরে পরীক্ষার হলের শেষ সময়ের কথা। জবেদ উত্তরপত্রের শেষ পাতায় লিখছে আজেবাজে খাতা। তাই দেখে আমিও লিখছি, পরে স্যারের পিটুনি, স্যারের হাত ধরে চিল্লিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হাত-পা ধরার ঘটনা আমাকে স্মৃতিকাতর করে দেয়’
বাসে আসবার পথে জলিল সাহেবকে জামাল ব্যাপারী অনেক কথাই বলেছেন। তার মধ্যে তামীমুল- সোহানাদের বিষয়েও অনেক কথা হয়েছে। বাস্তব তামীমুলকে দেখে জলিল সাহেব স্মৃতির পাতায় ভ্রমণ করতে থাকেন। মনে পড়ে যায় তার নিজের জীবনের অনেক স্মৃতি।
চাকুরিসূত্রে তামিমুল থাকেন ময়মনসিংহে। ছোট একটি বাসা, বেশ সাজানো- গোছানো। বাসাটি ছোট হলেও ড্রয়িংসহ দুই রুমবিশিষ্ট বাসাটি খুবই চমৎকার, মুহূর্তেই মন ভরে যায়। ১০ বছর আগে এখানকার নাথুপুর কলেজে ব্যবস্থাপনা বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ হয় তামিমুলের। ৪০ বছর বয়সে এই চাকুরি হয় তার। চাকুরির সময় ১০ বছর পেরিয়েছে, বেঁচে থাকলে এখনো ১০ বছরের মতো চাকুরি আছে তার। ময়মনসিংহের সবকিছু ভালো লাগলেও চাকুরি জীবন শেষে এলাকায় ফিরে যাবার ইচ্ছা। তাই এই এলাকায় জমি বা বাড়ি কোন কিছুই করার আগ্রহ দেখাননি, শেষ বয়সটা দেশেই থাকতে চান। কাটাতে চান রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজন এবং এলাকার মানুষের সাথে। দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে বসবাস করার কারণে এখানকার অনেক মানুষ তার পরিচিত, অনেক জায়গা এখন তার নখদর্পণে। মন খুলে পরিচয় না দিলে সহজে কেউ বুঝতে পারে না তার বাড়ি এই জায়গায়, নাকি অন্য জায়গায়। অনেকেই তাকে জন্মসূত্রে এই এলাকার মানুষ হিসেবে জানেন, তার কথাতেও তার প্রমাণ আছে। কথা বলার সময় অত্র এলাকার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তার কথায় প্রমিত বাংলার ব্যবহার যেমন আছে, তেমনি আছে স্থানীয় ভাষাও। কথার মধ্যে অটোমেটিক্যালী মুখ থকে বেরিয়ে আসলো করছুন, খাইছুন, গেছুন, মিলো, মসজিদো, কলেজো, নামাজো, স্কুলো, দেশো, মোড়ো, ঢোল মানিক, বায়সাকলা, আধান, কুষাণ, মিষ্টি লাউ প্রভৃতি আঞ্চলিক শব্দ।
একেবারে খাস দিলের মানুষ তামিমুল। কথা একটু বেশি বললেও মনে কোন ময়লা নেই তার। তিনি চুপচাপ থাকলে বড় বেশি বেমানান দেখা যায়। কথা বলতে থাকলেই তাকে প্রকৃত তামিমুল মনে হয়। কথা বন্ধ থাকা তার চরিত্রের সাথে মানায় না। দোষ-গুণ যাই বলি তার বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি একই কথা বারবার বলেন। তবে খারাপ লাগে না। কথায় এক ধরণের মাধুর্য থাকায় এমন অনুভূতি কাজ করে। যারা কথা কম বলায় অভ্যস্ত, তারা কেবলই শুনতে থাকেন তার কথা। তাদের জন্য তামিমুল একজন উপযোগী মানুষ।
এদিকে যাত্রাজগতের মানুষ জামাল ব্যাপারী। সাতক্ষীরা থেকে ময়মনসিংহ আসার পথে এই খালাতো দুলাভাই সম্পর্কে অনেকবার জলিল সাহেবকে অনেক কথা বলেছেন। তামিমুলের সাথে সরাসরি সাক্ষাতে পাওয়া যায় তার প্রমাণ।
এক সময় যাত্রাপালায় অভিনয়ের জন্য সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন জামাল ব্যাপারী। যাত্রা জগতের মহানায়ক মুকুন্দঘোষ অশোক ঘোষের নিয়মিত সঙ্গী হিসেবে তার একটা পরিচিতি আছে।ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক জায়গা তার চেনা। মনে হয় এই এলাকায় তার বাড়ি, তিনি এখানেই বসবাস করেন। তিনি বাসে আসতে আসতে সাবলীলভাবে বলছিলেন দেউখোলা, দাপুনিয়া, ভবানীপুর, পুটিজানা, বালিয়ান, আছিম, বোরুকা, কৈয়েরচালা, কুশমাইল, তালতলা, গৌরীপুর, পলাশতলী, ভালুকজান, ছলির বাজার, বাকতা, রাঁধাকানাই, চকরাঁধাকানাই, জোরবড়ীয়া, গারোবাজার প্রভৃতি নাম। হুমগুটি সম্পর্কে জলিল সাহেবকে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে তার অনেক কথা খরচা করতে হয়েছে। তাকে বলতে হয়েছে, ‘ হুমগুটি ময়মনসিংহের একটি ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় খেলা। এর আরেক নাম গুমগুটি খেলা। পহুরা বা পৌষ মাসের শেষ দিনে হয় খেলাটি। পৌষ মাসের শেষ দিনটি আঞ্চলিক ভাষায় পহুরা নামেই পরিচিত। ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার তেলিগ্রাম বড়ইআটা গ্রাম এই খেলার কেন্দ্রস্থল। এলাকার মানুষ মুখে মুখে বলে একসময় মুক্তাগাছার জমিদার শশীকান্ত আচার্য এবং বৈলরের জমিদার হেমচন্দ্র রায়ের মধ্যে জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই বিরোধ সমাধানে দুই জমিদার যৌথভাবে প্রজাদের মধ্যে কৌশল ও শক্তির খেলা হুমগুটির আয়োজন করেন।এই খেলাটি অত্র এলাকায় চলে আসছে আড়াইশ বছরের বেশি সময় ধরে।’

সাহিত্য বিভাগের আরো খবর

আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর