আপনার শিশুকে সময়মতো টিকা দিন।
‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ স্লোগানটি জাতীয় জনসংখ্যা নীতি-২০১২ এ ধারণ করা হয়েছিল, পরবর্তীতে ২০১৮ সাথে রুপান্তরিত হয়ে এটি এখন ‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’। আজ থেকে ৫০ বছর আগেও কিন্তু ব্যাপারটি এমন ছিল না। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির নীট হার ছিল ৩.৪ শতাংশ। প্রত্যেক দম্পতি তখন সাত বা আটজন সন্তান জন্ম দিতেন। শুধুমাত্র দারিদ্র্য, অশিক্ষা, শেষ বয়সে অবলম্বন, অসচেতনতা, গ্রাম্যক্ষেত্রে লাঠির জোর বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে মানুষ অধিক সন্তান জন্ম দিতেন ব্যাপারটি পুরোপুরি ঠিক নয়। অধিক জন্মহারের পেছনে একটি অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অধিক মাত্রায় শিশুমৃত্যুর হার। আমাশয়, কলেরা, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, গুটি বসন্ত, জলাতঙ্ক, পানিবাহিত অন্যান্য রোগবালাই ছিল সর্বোচ্চ মাত্রায়। অর্থাৎ চিকিৎসাবিজ্ঞান ততটা উন্নত ছিল না বলে মানুষ অধিক সন্তান নিতেন যাতে শেষ পর্যন্ত কয়েকটা বা অন্তত একটা সন্তান বেঁচে থাকে। যেমন, আমার দাদারা নয় ভাই-বোন ছিলেন, দাদার সন্তান আটজন। সময়ের সাথে সাথে চিকিৎসা সেবা উন্নত ও সহজলভ্য হয় এবং মা ও শিশুর অকালমৃত্যুর হার কমে আসে। এছাড়াও সরকার সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) এর মাধ্যমে বিনামূল্যে দশটি দুরারোগ্য রোগের টিকা সরবরাহ করে। সচেতনতা ও চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নের ফলে মানুষ এখন নির্ভার, যার ফলে দেশে বর্তমানে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার উভয়ে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকার ১৯৭৬ সালে জনসংখ্যা সমস্যাকে দেশের এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু জনসংখ্যা দেশের সম্পদ নয়, দক্ষ জনসংখ্যা দেশের জনসম্পদ। তাই সরকার চিকিৎসা শাস্ত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে পর্যন্ত উদ্বুদ্ধ ও বিনামূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সরবরাহ, বিজ্ঞাপন, উঠান বৈঠক ও মহিলা সমাবেশ এর মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইসিডিডিআরবি উদ্ভাবিত স্যালাইনসহ ওষুধ শিল্পকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে জনসংখ্যা বিষয়ক সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন। ফলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ চিকিৎসা খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে এবং এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরপর বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৬.৫১ বছর। গত ৫০ বছরে ধাপে ধাপে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে বর্তমানে তা ৭২.৬ বছরে পৌঁছেছে। গড় আয়ুর পাশাপাশি মৃত্যুহার কমেছে, শিশুমৃত্যু হার কমেছে, জন্মহারও কমেছে। ১৯৭২ সালে প্রতি হাজারে শিশুমৃত্যু হার ছিল ১৪১ জন, ২০২৪ সালে এ হার কমে দাঁড়য়েছে ২৭ জনে। প্রতি হাজারে ১৯৭২ সালে জন্মহার ছিল ৫০ জন, ২০২৪ সালে এসে তা ১৯ দশমিক ৪ এ নেমে এসেছে। মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ছিল ২০ জন। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১ জনে। ১৯৭২ সালে দেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ৭ দশমিক ৫ কোটি। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যা ২০২৪ সালের হিসেবে ১৬.৯৮ কোটি। মোট জনসংখ্যার আকার বাড়লেও কমেছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। ১৯৭২ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২২ শতাংশে। [উৎস: বিবিএস-২০২৪]
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বাংলাদেশ সরকারের সফল উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি বিশ্বের প্রতিটি শিশুর জন্য টিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইপিআইয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল এবং ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে বাংলাদেশে ইপিআই কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরে ১৯৮৫ সালে ইপিআই কার্যক্রম সারা দেশে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং জাতিসংঘের কাছে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর জন্য টিকা নিশ্চিতকরণে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশে ইপিআইয়ের আওতায় ১০টি টিকা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়, যেমন যক্ষ্মা (টিবি) এর ক্ষেত্রে বিসিজি টিকা; ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি (পারটুসিস), ধনুষ্টংকার (টিটেনাস), হেপাটাইটিস বি, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি এই পাঁচটি রোগের টিকা একত্রে পেন্টাভ্যালেন্ট; নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া এর টিকা পিসিভি; পোলিও এর ক্ষেত্রে বিওপিভি বা ফ্র্যাকশনাল আইপিভি এবং হাম ও রুবেলা এর জন্য এমআর টিকা দেওয়া হয়। ইপিআইয়ের জন্মলগ্নে ৬টি টিকার মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলে ও গত কয়েক বছরে ভ্যাকসিন শিডিউলে আরও বেশ কিছু নতুন টিকা যোগ করা হয়েছে, ২০০৩ সালে হেপাটাইটিস বি, ২০০৯ সালে এইচআইবি, ২০১২ সালে রুবেলা ২০১৫ সালে পিসিভি এবং আইপিভি, এমআর দ্বিতীয় ডোজ ২০১৫ সালে এবং ২০১৭ সালে এফআইপিভি উল্লেখযোগ্য। ইপিআই কর্মসূচি প্রবর্তনের আগে বাংলাদেশে ছয়টি প্রধান প্রাণঘাতী রোগে প্রতিবছর প্রায় ২৫ লাখ শিশু মারা যেত; কিন্তু বর্তমানে সেই মৃত্যুহার কমেছে ৮১.৫ শতাংশ।। টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি) ২০১৯ সালে বাংলাদেশকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পদকেও ভূষিত করে।
সঠিক সময়ে সঠিক টিকা দেওয়া আপনার সন্তানকে দুরারোগ্য সকল রোগ থেকে রক্ষা করবে। শিশু জন্মের পরপরই বিসিজি টিকা দিতে হয়। এরপর শিশুর বয়স যথাক্রমে ছয় সপ্তাহ, দশ সপ্তাহ এবং চৌদ্দ সপ্তাহ পূর্ণ হলে পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি ও বিওপিভি টিকার একটা করে ডোজ দেওয়া হয়। আর শিশুর বয়স যথাক্রমে নয় মাস এবং পনের মাস পূর্ণ হলে এমআর টিকা দেওয়া হয়। এছাড়াও এক বছরের কম বয়সী শিশুকে একটি করে নীল রঙের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল এবং এক বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুকে একটি করে লাল রঙের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। আর শুধু পনের থেকে ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকার রোগ প্রতিরোধে টিটি টিকা দেওয়া হয়। সবগুলো টিকা সরকার বিনামূল্যে সরবরাহ ও প্রদান করে, নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সময়মতো উপস্থিত হয়ে সন্তানের সুরক্ষায় উপযুক্ত টিকা দেওয়া। এতে আপনার সন্তান, দেশ ও রাষ্ট্র সবাই উপকৃত হবেন।
১৫ মার্চ ২০২৫ রোজ শনিবার দিনব্যাপী সারা দেশের ন্যায় ময়মনসিংহের প্রত্যেকটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামের নির্ধারিত স্থান হতে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। সিভিল সার্জন ময়মনসিংহ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রায় দশ লক্ষাধিক শিশুকে এ ক্যাপসুল খাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় ০৬ মাস থেকে ১১ মাস বয়সী প্রতিটি শিশুকে একটা করে নীল ক্যাপসুল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুকে একটি করে লাল ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। ভিটামিন-এ এর অভাবে শিশুদের রাতকানা ও জেরোফথ্যালমিয়া রোগ হয়। ফলে এর অভাবে শিশু অল্প বয়সে অন্ধত্ব বরন করতে পারে। বছরে দুইবার ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। ভিটামিন-এ শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখে, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে এবং ক্ষত পূরণের সময় এপিথেলিয়াল টিস্যু পুনরুদ্ধার ও ত্বকের শুষ্কতা দূর করে। ভিটামিন-এ এর অভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ডায়রিয়ার ব্যাপ্তিকাল বৃদ্ধি ও হাম পরবর্তী জটিলতা বৃদ্ধি পায়, শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ত্বকের শুষ্কতা ও মলিনতা এবং রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। তাই, ১৫ মার্চ ২০২৫ রোজ রবিবার ০৬ মাস থেকে ০৫ বছর বয়সী শিশুকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিয়ে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ান। ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ভরাপেটে খাওয়ানো ভাল।ভিটামিন-এ ক্যাপসুল শিশুর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
টিকাদান কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো রোগপ্রতিরোধের মাধ্যমে জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি সুস্বাস্থ্যে বলীয়ান বাংলাদেশ গঠন করা। আমরা সবাই মিলে কাজ করলে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে শতভাগ টিকাদানের কাভারেজের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে এবং আমরা সারা বিশ্বের মধ্যে একটি ভ্যাকসিন প্রতিরোধযোগ্য রোগমুক্ত দেশ হিসেবে পরিচিত হব, যা বংলাদেশের মানুষের জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন ও জীবন রক্ষায় যেমন অবদান রাখবে, তেমনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে। আপনার শিশুকে সময়মত টিকা দিন, শিশুর রোগমুক্ত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করুন।
[লেখক: বিসিএস তথ্য ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ ]
আপনার মতামত লিখুন :