
প্রথম ধাপে নজিরবিহীন ভোট পড়ার পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় ও শেষ ধাপে বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে কড়া নিরাপত্তা বলয়ে আজ ভোটগ্রহণ হবে ১৪২ আসনে, যার প্রত্যেকটিতে টান টান উত্তেজনার মধ্যে উঁকি দিচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, রাজ্য শাসনে পুনরাবৃত্তি নাকি পরিবর্তন ঘটতে চলেছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুখোড় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ঘাস ফুল প্রতীক নাকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির পদ্মফুল প্রতীক সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় পাবে, সেই লড়াইয়ের সমাপনী দিন আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল)।
চন্দ্রকেতুগড়, তমলুক, কর্ণসুবর্ণের মতো প্রাচীন সভ্যতার পাশাপাশি সুলতানি, বাদশাহী, ঔপনিবেশিক রাজরাজড়াদের স্মৃতিবাহী স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুঁজিবাদী, মার্ক্সবাদী, ধর্মবাদী শক্তির রাজনৈতিক মেরুকরণে মধ্যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাজ্য শাসনের দায়িত্ব কার ওপর দিচ্ছেন উত্তর-আধুনিক ভোটাররা, সেই সিদ্ধান্ত আজ বন্দি হবে ইভিএমে; যা গণনার মধ্য দিয়ে মুক্ত করা হবে ৪ মে অর্থাৎ ফলাফল ঘোষণা করা হবে সেদিন।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৭ টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে টানা ভোটগ্রহণ চলবে। সেই লক্ষ্যে মঙ্গলবার সকাল থেকে ইভিএম মেশিন নিয়ে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছাতে দেখা যায় নির্বাচন কর্মকর্তাদের। তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী।
পশ্চিমবঙ্গের সাতটি জেলার ১৪২টি বিধানসভা আসনে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন এবার আটঘাট বেঁধে ময়দানে রয়েছে। ভোটের দিন অশান্তি এড়াতে নজিরবিহীন তৎপরতা দেখাচ্ছে কমিশন। প্রতিটি বুথ ও স্পর্শকাতর এলাকায় বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
সাতটি জেলার মধ্যে নদিয়ায় রয়েছে ১৭টি আসন, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩৩টি, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩১টি, কলকাতায় ১১টি, হাওড়ায় ১৬টি, হুগলিতে ১৮টি, পূর্ব বর্ধমানে ১৬টি।
শেষ ধাপে ১৪২ আসনে লড়াই করছেন ১ হাজার ৪৪৮ জন প্রার্থী; যাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ২২০ জন।
প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দুজন হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলীয় নেতা বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী। শতাব্দী রায়, দীপক অধিকারী (দেব), পরমব্রত থেকে বিনোদনজগতের একঝাঁক সেলিব্রেটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
৩ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৩৭ জন ভোটার শেষ ধাপে তাদের নেতা নির্বাচনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন। এই ধাপে পুরুষ ভোটার ১ কোটি ৬৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬২৭ জন এবং নারী ভোটার প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৭৯২ জন।
তবে ভোটারের বয়স বিশ্লেষণে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো শতবর্ষী ভোটার। দ্বিতীয় ধাপে ৩ হাজার ২৪৩ জন শতায়ু ভোটার তাদের রায় দিতে চলেছেন।
ভোটগ্রহণের জন্য ১৪২টি আসনেই পর্যাপ্ত কেন্দ্র ও বুথ স্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে বুথ রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ১টি।
নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন। প্রতিটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে মোতায়েন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। মোট ২ হাজার ৩৪৮ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী রাখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তর ২৪ পরগনায় ৫০৭, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৪০৯, কলকাতায় ২৭৩, ব্যারাকপুরে ১৬০, ডায়মন্ড হারবারে ১৩৪, বারুইপুরে ১৬১, পূর্ব বর্ধমানে ২৬০ ও বনগাঁয় ৬২ কোম্পানি মোতায়েন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে মোতায়েন থাকছে রাজ্য পুলিশের ৩৮ হাজার ২৯৭ সদস্য। নিউটাউনে রয়েছে স্পেশাল কন্ট্রোল রুম। প্রতিটি বুথে কমপক্ষে হাফ সেকশন কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকছে। যেখানে তিনটি বুথ, সেখানে দেওয়া হয়েছে এক সেকশন কেন্দ্রীয় বাহিনী। পাঁচটি বুথ হলে সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাখা হয়েছে দুই সেকশন।
নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষকও রাখা হয়েছে। ১৪২ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক, ৯৫ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক ও ১০০ জন ব্যয় পর্যবেক্ষক রাখা হয়েছে দ্বিতীয় ধাপে।
পর্যবেক্ষক, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে বেশ কয়েকটি সহিংসতার ঘটনা দেখা গেছে। জগদ্দল বিধানসভার অন্তর্গত জগদ্দল থানার সামনে গত রবিবার রাতে বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়; তাতে বেশ কয়েকজন আহত হন। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এমনকি কেন্দ্রীয় বাহিনীর একজন আহত হন। ওই ঘটনায় তৃণমূলের চার কর্মী-সমর্থকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গত সোমবার সকালে আরামবাগ লোকসভার সংসদ সদস্য তৃণমূলের কংগ্রেসের মিতালীবাগের গাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠে। গুরুতর আহত হন তিনি; পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এবারে নির্বাচনি প্রচারের মাঠে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ইস্যু বরাবরের মতোই হাতিয়ার করেছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে বিজেপির মাঠপর্যায়ের নেতারাও ইস্যুটি চাঙ্গা রেখেছেন। মমতার বিরুদ্ধে সীমান্ত খুলে রেখে বাংলাদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশ ঘটানোর অভিযোগ তুলেছেন তারা। মমতাও সীমান্ত অরিক্ষত রাখার জন্য মোদি সরকারকে তুলাধুনা করেছেন। দুই দলের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের তীব্রতাকে আমলে নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সিল করেই তবে ভোটগ্রহণ করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপে ২৩ এপ্রিল নজিরবিহীন ভোটগ্রহণ হয়, যা ছিল রেকর্ড ৯৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। অবাধ নির্বাচনের গণতান্ত্রিক কোনো দেশে এই হারে ভোট পড়ার হার বিরল।
আপনার মতামত লিখুন :