Agaminews
Dr. Neem Hakim

বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকদের বাতিঘর পাবনা প্রেসক্লাব আজ ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : তিনদিনের বণার্ঢ্য উৎসবের আয়োজন


audhamyabangla প্রকাশের সময় : মে ১, ২০২৬, ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ / ২০
বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকদের বাতিঘর পাবনা প্রেসক্লাব আজ ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : তিনদিনের বণার্ঢ্য উৎসবের আয়োজন


।। এবিএম ফজলুর রহমান।।

প্রখ্যাত সাংবাদিক আব্দুল গনি হাজারী, সৈয়দ আসাফ উদ দৌলা সিরাজি, ফজলে লোহানী, কামাল লোহানী, মহানয়িকা সুচিত্রা সেন, উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত গীতিকার গৌরি প্রসন্ন মজুমদার, সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী, ওস্তাদ বারীন মজুমদার, কবি বন্দে আলী মিয়া, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন আহমেদসহ অসংখ্য গুনি সাংষ্কৃতিক ও সাহিত্যিকের জন্মভুমি বৃহত্তর পাবনা। ব্রিটিশ পরবর্তি শাসনামলপুর্ব এ অঞ্চলে সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটে। পঞ্চাশের দশকে হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিকতা শুরু করেন। তারই ধারবাহিকতায় ১৯৬১ সালে এক ঝাঁক কর্মট সাংবাদিক প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী পাবনা প্রেসক্লাব। পরবর্তিতে ঐ বছরের ৮ ও ৯ মে সারা পুর্বপাকিস্তানের মফস্বল সাংবাদিকদের সমাবেশ হয় পাবনায়। সেখানে মফস্বল সাংবাদিকদের দাবী আদায়ে গঠিত হয় পুর্বপাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি।পাবনার সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার গৌরব ও অহংকারের প্রতিষ্ঠান তার নাম পাবনা প্রেসক্লাব। আজ ১ মে পাবনা প্রেসক্লাব পাবনা তথা সারা দেশের মফস্বল সাংবাদিকদের মুখ উজ্জ্বল করে ৬৬ বছরে পা রাখবে। মহান ভাষা আন্দোলন, খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলন, ভুট্রা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাবনা প্রেসক্লাবের ভুমিকা ছিল অগগ্রন্য। এই প্রেসক্লাবের অন্তত ১২ জন সদস্য সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এ ছাড়া ৫ একুশে পদক লাভ করেন।
১৯৬১ সালের ১ মে পাবনা শহরে পাবনা প্রেসক্লাবের গোড়াপত্তন ঘটে। সেই থেকে অনেক স্মৃতি, নানা ইতিহাস ও গৌরবময় ঘটনার সঙ্গে পাবনা প্রেসক্লাবের নাম জড়িয়ে রয়েছে। সারা দেশে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য ও সাংবাদিকদের একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও পাবনা প্রেসক্লাব সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এই প্রতিষ্ঠান এখনো দেশের মধ্যে অখন্ড এবং ঐক্যর অন্যন্য নজির হিসেবে দৃষ্টান্ত হয়ে রইবে। তার বাস্তব উদহরণ বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জনাব জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি গত ৮ এপ্রিল পাবনা প্রেসক্লাব সফরের সময় সারা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা পাবনা প্রেসক্লাব পরির্দশন করুন ; ভাড়া আমি দেব। আর পাবনা প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ আপনাদের আপ্যায়ন করবে। সাংবাদিকদের ঐক্যের নজির কাকে বলে দেখে যান”। যা নজিরজিহীন। একজন তথ্যমন্ত্রীর সরল স্বীকৃতি সারা দেশের সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মেসেজ দেয়।
পদ্মা যমুনা বিধৌত এবং ইছামতি নদী তীরে গড়ে উঠা পাবনার জনপদে সাংবাদিকতার সুত্রপাত ঘটে উনিশ শতকের প্রথম দিকে। এ অঞ্চলের বিরাজমান সমস্যা সমাধানে দিক নির্দেশনায়, সৎ বস্তুনিষ্ট ও বলিষ্ঠ লেখনির মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে এবং অসহায় নির্যাতিত মানুষের চালচিত্র নি:শঙ্কভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার ব্রত নিয়ে সর্বপরি সাংবাদিকগণ ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীতা অনুভব করেন। সাংবাদিকতায় লালিত এই ঐতিহ্যের ধারায় বিশ শতকের ষাটের দশকের শুরুতে তৃনমূল পর্যায়ের সাংবাদিকতা পেশার স্বীকৃতির দাবীকে সামনে রেখে ১৯৬১ সালের ১ মে পাবনা শহরে স্থাপিত হয় পাবনা প্রেসক্লাব।
পাবনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পাক হিতৈষী’র প্রকাশক-সম্পাদক, দৈনিক আজাদ ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তানের (এপিপি) এর পাবনা প্রতিনিধি একেএম আজিজুল হক বিএসসি ক্যাল এর সভাপতিত্বে তার বাসা সানভিউ ভিলায় অনুষ্ঠিত সভায় তিনিই (একেএম আজিজুল হক) পাবনা প্রেসক্লাবের প্রথম সভাপতি এবং সংবাদ প্রতিনিধি শ্রী রণেশ মৈত্র সাধারন সম্পাদক নির্বাচত হন। এ ছাড়া দৈনিক ইত্তেফাকের পাবনা প্রতিনিধি এম আনোয়ারুল হক, বিশিষ্ট চিকিৎসক মেজর (অব.) ডা. মোফাজ্জল হোসেন, লোক শিক্ষক শহীদ মাওলানা কছিমুদ্দিন আহমেদ, ফটোগ্রফার শ্রী হিমাংশু কুমার বিশ্বাস প্রমুখ অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন।  বর্তমানে পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য সংখ্যা ৬২।
এর মধ্যে সম্মানীয় জীবন সদস্য স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী, ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন, সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মাশাল (অব.) একে খন্দকার প্রয়াত হয়েছেন।  এ ছাড়া বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও স্কয়ার টয়লেট্রিজের ব্যবস্থাপনা অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু পাবনা প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য রয়েছেন। পাবনা প্রেসক্লাবের আরেক অকৃত্রিম বন্ধু প্রখ্যাত শ্রমিকনেতা ও পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি স কল প্রয়োজনে বিপদে আপদে ৪৫ বছর ধরে পাবনা প্রেসক্লাবের সঙ্গে রয়েছেন। তার সহায়তায় পাবনা প্রেসক্লাবের স্পোর্টস রুম, ছাদে সাংবাদিকদের দৃষ্টি নন্দন বসার স্থান এবং পাবনা প্রেসক্লাবের তৃতীয় তলায় আরেকটি হল রুমের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকাশ্যে বা গোপনে তিনি সাংবাদিকদের স্বার্থে নিরলস কাজ করছেন।এ ছাড়া মহামান্য রাষ্ট্রপতির সহায়তায় সাংবাদিকদের কল্যান তহবীল প্রতিষ্ঠা ও অত্যাধুনিক অফিস কক্ষ, স্কয়ার গ্রুপর পতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরীর সহায়তায় প্রথম ভিআইপি মিলনায়তন এবং লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার বছর ৮- ৯ মে পাবনায় অনুষ্ঠিত হয় পুর্ব পাকিস্তান মফস্বল সাংবাদিক সম্মেলন। যে সভা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায় পুর্ব পাকিস্তান মফস্বল সাংবাদিক সমিতি যা বর্তমানে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি হিসেবে পরিচিত। সেই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন মন্ত্রীসভার সদস্য বগুড়ার মো: হাবিবুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পাকিস্তান অবজারভারের সম্পাদক আব্দুস সালাম, মনিং নিউজের এসজিএম বদরুদ্দিন। যে সম্মেলনের মাধ্যমে মফস্বল সাংবাদিকরা পেশার স্বীকৃতি তথা রিটেইনার, লাইনেজ, পোষ্টাল চার্জ, টেলিগ্রাম চার্জ, ছবির বিলসহ অন্যান্য খরচ পাওয়া শুরু করেন। পাবনা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই সেদিন সংবাদপত্রে মফস্বলে কর্মরত প্রতিনিধিদের পেশার স্বীকৃতি ঘটেছিল।
পাবনা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার পর একেএম আজিজুল হক পাবনা প্রেসক্লাবের প্রথম সভাপতি এবং সংবাদ প্রতিনিধি শ্রী রণেশ মৈত্র প্রথম সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তিতে এম আনোয়ারুল হক, মির্জা শামসুল ইসলাম, প্রফেসর আব্দুস সাত্তার বাসু, অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, রবিউল ইসলাম রবি, অ্যাডভোকেট মুহম্মদ মহিউদ্দিন, প্রফেসর শিবজিত নাগ, আব্দুল মতীন খান, এবিএম ফজলুর রহমান, প্রফেসর রুমী খন্দকার, উৎপল মির্জা,  আহমেদ উল হক রানা, আখিনুর ইসলাম রেমন, সৈকত আফরোজ আসাদ বিভিন্ন সময় এক বা একাধিকবার সভাপতি সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে আখতারুজ্জামান আখতার সভাপতি ও জহুরুল ইসলাম সরাসরি ভোটে সাধারণ সম্পাদক  নির্বাচিত হয়ে ঐতিহ্যবাহি এই প্রেসক্লাবের দায়িত্ব পালন করছেন।
পাবনা প্রেসক্লাবের অতীত ঐতিহ্য ও বিশাল ইতিহাস থাকলেও আজও পাবনা প্রেসক্লাবের নিজস্ব ভবন হয়নি। পরিত্যক্ত সম্পত্তির উপর গড়ে উঠা এই ক্লাবটির শরীরে শীর্ণতা থাকলেও মর্যাদা ও আভিজত্যে এখোনো অটুট। তাই পাবনা প্রেসক্লাব সব সময় পাবনা তথা দেশের সাংবাদিক ও মানুষের মনি কোঠায় মর্যাদার আসীনে অধিষ্ঠিত থাকবে এটা সকল সদস্যের প্রত্যাশা।৬৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে এবং এই দীর্ঘ পথচলার গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে স্মরণীয় করতে রাখতে ১ মে থেকে ৩ মে পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবার(১ মে) সকাল ১০টায় কেক কাটা ও মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে। কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন ২ মে শনিবার সকাল ১০টায় পাবনা প্রেস ক্লাব চত্বর থেকে বের করা হবে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে প্রীতি সম্মিলন। একই দিন সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সমাপনী দিন ৩ মে রবিবার সন্ধ্যায় পাবনা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে সদস্যদের পরিবারের মিলনমেলা, র‌্যাফেল ড্র ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। কর্মসুচির দ্বিতীয় দিন ২ মে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ভূমি মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু এমপি। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এবং অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন পাবনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, সম্মানিত জীবন সদস্য ও বিশিষ্ট শিল্পপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল, পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব, পাবনা-৪ আসনের সংসদ আসনের সংসদ সদস্য আবু তালেব মন্ডল,পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আলী আছগার। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (যুব কর্মসংস্থান) মো. সায়েদ বিন আবদুল্লাহ, জেলা পরিষদ প্রশাসক বীরমুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম বিশু, জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার জাহিদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করবেন ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সাদিয়া সুলতানা লিজা ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী মুহিন খানসহ বিশিষ্ট শিল্পীবৃন্দ। পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার ও সাধারন সম্পাদক জহুরুল ইসলাম জানান, ৬৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপনের জন্য বর্নিল আয়োজনের যাবতীয় প্রস্ততি সম্পন্ন হয়েছে। তারা আরো জানান, ১৯৬১ সালের ১ মে পাবনা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা হয়। একইদিন দু’দিন ব্যাপী সম্মেলনের মাধ্যমে মফস্বল সাংবাদিকদের সেসময়কার একমাত্র দাবি আদায়ের সংগঠন বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি গঠন করা হয়। যাত্রার শুরু থেকে পাবনা প্রেসক্লাব শতভাগ পেশাদারিত্ব এবং একটি মর্যাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সব মহলে আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে পাবনা প্রেসক্লাবে মহান ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী সদস্য যুক্ত হন।

লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, স্টাফ রির্পোটার, দৈনিক সমকাল, পাবনা এবং সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেসক্লাব।

Uncategorized বিভাগের আরো খবর

আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর