
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের সময় গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন ছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম। মানুষ যে কথাগুলো জ্ঞাতসারে বললে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপ আসতে পারে, সেসব কথা ফুটিয়ে তোলে দেয়ালে দেয়ালে। রঙের তুলিতে শিল্পীর মনের মাধুরি মিশিয়ে দেয়ালে আঁকা এসব গ্রাফিতি জুলাই গণআন্দোলনের সময় জনমত তৈরিতে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। সাধারণ জনগণের মনের ভাষা হয়ে উঠেছিল দেয়ালের গ্রাফিতি। ইতিহাসে কোনো কোনো সময় এমন আসে যখন একেকটা মিনিটের গুরুত্ব, ব্যাপ্তি ও গভীরতা শত বছরকেও ছাড়িয়ে যায়। আমাদের জীবনে চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেরকম গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্দোলনের মর্মবাণীর সুন্দর সুর যাদের বুকে বেজেছে, তারা ব্যতীত অন্য কেউ এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারবে না। জুলাইয়ের শুরুতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে থাকে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে তৎকালীন প্রশাসনের অযাচিত হস্তক্ষেপ, ন্যায্য ও বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, শক্তি প্রয়োগ ও নির্বিচারে গুলি-বর্ষণ একে সহিংস আন্দোলনে রূপ দেয়। ছাত্ররা কমপ্লিট শাটডাউন, বাংলা ব্লকেড এর মতো নতুন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ক্রমেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সারাদেশের ছাত্ররা একাত্মতা ঘোষণা করে। সৃষ্টিশীল ছাত্র জনতা আন্দোলনকে উঠিয়ে আনে গান-কবিতা-ছন্দ-স্লোগানে আর দেয়ালচিত্রে। জনমনে সহজে সাড়া জাগাতে দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয় ক্ষোভ, দ্রোহ ও প্রতিবাদের ভাষা। শিল্প-সংস্কৃতির নগরী খ্যাত ময়মনসিংহ শহরের বিভিন্ন রাস্তার দেয়াল হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের কন্ঠস্বর। গ্রাফিতি ও দেয়াললিখন হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ জনসংযোগ। মানুষের মনের কথাগুলো রং ও তুলির আচরে শৈল্পিক ভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নগরীর দেয়ালগুলোতে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু এবং ০৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেয়ালে প্রতিবাদের সুর রচিত হয়েছে। অধিকার আদায়ে বাঙালি জাতির আন্দোলনের ইতিহাস নতুন নয়। যেমন, দেয়ালচিত্রে অঙ্কিত – ‘৫২, ৬৯, ৭১, ৯০, ২৪ এবং চাবি আনলকড’ অর্থাৎ বুঝানো হচ্ছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২৪ এর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন এক সূত্রে গাথা। তেমনি লেখা ‘ছাত্র যদি ভয় পাইতো বন্দুকের গুলি, উর্দু থাকতো মাতৃভাষা উর্দু থাকতো বুলি’ অর্থাৎ ছাত্ররা প্রতিবাদ পূর্বেও করেছে এবং তার অধিকার সে আদায় করেছে। বর্তমানেও তার অধিকার সে আদায় করেই ছাড়বে।’কোটা না মেধা? মেধা মেধা’ স্লোগানকে ধারণ করে সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে মেধার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার নিয়োগ নিশ্চিত করতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এ আন্দোলন যাত্রা শুরু করে। মূলত ২০১৮ সালের কোটা সম্পর্কিত পরিপত্র হাইকোর্টের এক রায়ে অবৈধ ঘোষণা করে কোটা পুনর্বহাল করা হলে সচেতন ছাত্রসমাজ অধিকার আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন করে ও দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় কোটা বিরোধী আন্দোলন একসময় কোটা থেকে বের হয়ে গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত হয় এবং সারাদেশের সাধারণ জনগণ তাতে সংহতি জানায়। এ সময় দেয়াল লিখন ও দেয়ালচিত্র প্রতিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখা দেয়। জনসংযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণে গ্রাফিতি হয়ে উঠে প্রতিবাদের সুর। একইভাবে, ময়মনসিংহেরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দেয়াললিখন ও দেয়ালচিত্র খচিত হতে দেখা যায়। নগরীর মুমিনুন্নেসা মহিলা কলেজের দেয়াল, টাউনহল, জিলা স্কুল, নতুন বাজার, হরিকিশোর রায় রোড, ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড, ময়মনসিংহ রেলস্টেশন, ফুলবাড়িয়া রোডসহ শহরের প্রায় সব জায়গাতেই এসব প্রতিবাদী বাক্য স্থান পেয়েছে। আগে যেসব দেয়াল পোস্টার, ব্যানার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা বিজ্ঞাপন এর ছবি দিয়ে সাটানো ছিল, আন্দোলনের সময় এবং আন্দোলন পরবর্তী সময়ে সেসব দেয়ালই এখন রঙিন সাজে সজ্জিত। আন্দোলনকে ঘিরে জুলাই এবং আগস্ট মাসে শহীদের স্মৃতি এবং বিভিন্ন ঘটনাসূত্র দেয়ালে স্থান পেয়েছিল। দেয়ালচিত্রের মধ্যে ছিলো শহীদ আবু সাঈদ এর বুক পেতে দেওয়ার প্রতিবাদী ছবি; নাটক কম করো দিও; পুলিশ কর্তৃক মানুষের গলা চেপে ধরার ছবি ইত্যাদি। আর দেয়াললিখন- বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর; আসছে ফাগুন আমরা হবো দ্বিগুণ; আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো জুলাই; পানি লাগবে কারো? পানি,পানি?;একজনকে মারতে কয়টা গুলি লাগে স্যার?; তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইরে ফেরত দে?; আমার একটা বোন আছে, আমারে যাইতে দেন; ছাত্র হত্যার বিচার চাই, আমার বেটাক মারলু কেন?; সোনার বাংলায় শকুনের থাবা, গণহত্যার বিচার চাই, সোনার বাংলা আজ মৃত্যুপুরী কেন?; রক্ত শোক নয়, শক্তি; নাটক কম করো পিও ইত্যাদি। এসব দেয়াললিখন ও দেয়ালচিত্রে আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ের দৃশ্যপট ও স্লোগান তুলে ধরা হয়েছে যা ছাত্রদের অধিকার আদায়ে করেছে স্বোচ্চার।স্মৃতিতে পুরো দেশব্যাপী চলে দেয়ালচিত্র এবং গ্রাফিতির কাজ। বিপ্লব আর বিজয়ের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে দেয়ালে দেয়ালে। ০৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেয়াললিখন ও দেয়ালচিত্রের চেহারা মোটামুটি বদলে যায়। নতুন বাংলাদেশে নতুনভাবে খচিত হয় ময়মনসিংহের দেয়ালগুলো। এগুলোর মধ্যে দেয়াললিখন ৩৬শে জুলাই, নতুন বাংলাদেশ; স্বাধীনতা এনেছি, সংস্কারও আনবো; বিকল্প কে? তুমি আমি আমরা; ধর্ম যার যার, দেশ সবার; এখানে যে ময়লা ফেলবে সে হাঊন আঙ্কেল; রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা; কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট; মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি ইত্যাদি। দেয়ালচিত্রে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, নতুন বাংলাদেশে নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীকী চিত্র; চেকমেট এর প্রতীকী ছবি যেখানে দাবা খেলার সৈন্য কর্তৃক রাজা অবরুদ্ধ; আইকনিক শহীদ আবু সাঈদের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেওয়া; শহীদ মীর মুগ্ধ এর পানি বহন এর প্রতীক ইত্যাদি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা-২০২৫ এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। যেমন- ০৭ জুলাই চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, রক্তে জুলাই ; ১৫ জুলাই – এক শহীদ এক বৃক্ষ কর্মসূচি ; ১৮ জুলাই -ম্যারাথন প্রতিযোগিতা ; ১৯ জুলাই – শহীদ স্মরণ সমাবেশ এবং শহীদ সাগরের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ ; ২৪ জুলাই – গ্রাফিতি ও দেয়াল চিত্র প্রদর্শনী ; ৩৪-৩৬ জুলাই তারুণ্যের উৎসব, ৩৬ জুলাই বিজয় মিছিল অন্যতম। পরিবর্তনটা আসুক আমাদের হাত ধরেই, এটাই জেন-জি এর দর্শন। ‘দুর্নীতির দিন শেষ, অধিকারের লড়াইয়ে বাংলাদেশ’ স্লোগানের মতো দেশের প্রতিটি সেক্টর হোক স্বচ্ছ, সুন্দর, দুর্নীতিমুক্ত ও জন-বান্ধব। জুলাই বিপ্লবে ছাত্ররা যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জীবন বাজি রেখেছে, রক্ত দিয়েছে; ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে এর সুফল পায় তার জন্য সকল স্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে দেশমাতৃকার গঠনে। কারণ দেশটা আমাদের, দেশটা ১৮ কোটি জনতার, আপনার আমার সবার।
#লেখক: বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।
আপনার মতামত লিখুন :