
সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে এলোমেলো তপ্ত হাওয়া। নতুন সোনালী পাকা ধানের গন্ধে মাতোয়ারা চারপাশ। তবে, কৃষকদের মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। তাদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক সংকট। আধুনিক হারভেস্টার মেশিনের ওপর নির্ভরশীল অনেকে পড়েছেন বড় বিপাকে। তেলের অভাবে হারভেস্টার মেশিন চালিয়ে ধান কাটা তাদের জন্য হয়ে উঠেছে কঠিন।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এবছর জেলায় আবাদকৃত ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমির মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০ হাজার হেক্টর জমির ধান কর্তন হয়েছে। এখনো বেশির ভাগ হাওরের ফসল আঁধাপাকা ও কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। পুরোপুরি ধান পাকতে আরো এক সপ্তাহ অথবা ১০ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে তারা।
সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের কৃষক মোহাম্মদ রাজন মিয়া রাইজিংবিডি ডট কম-কে বলেন, “ হাওরে মোটামুটি ধান পেকে গেছে, কিন্তু তেলের অভাবে হারভেস্টার মেশিন চালাতে পারছি না। শহরের পাম্পে গেলে পরিমাণ মতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের প্রতিদিন তেল দরকার হয় ৩৫ থেকে ৪০ লিটার। পাম্পে গেলে তেল দেয় মাত্র ৫ লিটার। ফলে ধান কেটে কিভাবে গোলায় নেব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। তেলের ব্যবস্থা না করলে আমাদের ক্ষতি হবে।”
একই হাওরের আরেক কৃষক সুলেমান মিয়া বলেন, “বৃষ্টি আর পানিতে ধান নষ্টের ভয়ে আছি। যদি তেল পাওয়া যেত, তাহলে আমরা কৃষকরা বাঁচতে পারতাম। আমাদের ধান যদি নষ্ট হয়, তাইলে আমাদের মরণ ছাড়া উপায় নেই।”
হাওর পাড়ের কৃষকরা জানিয়েছেন, যেসব জমির ধান পেকেছে তা শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারছেন না তারা। জনপ্রতি ৭০০-৮০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া না যাচ্ছে বলে জানান চাষিরা।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, “আমাদের হাওরে ধান পেকে গেছে, কিন্তু শ্রমিকের এতো পরিমাণ সংকট ধান কাটতে পারছি না। আগে বাইরের জেলা থেকে শ্রমিক আনা হতো, কিন্তু এবার বাইরের শ্রমিক আনতে খরচ অনেক বেশি পড়ছে। এখন যদি সময় মতো ধান কাটতে না পারি, তাহলে আমাদের সব কিছুই পানিতে নষ্ট হয়ে যাবে। শ্রমিক সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
শান্তিগঞ্জ উপজেলার কৃষক এখলাছুর রহমান বলেন, “ধান নিয়ে বড় বিপাকে পড়ছি গো বাবা। কাটার মানুষ পাচ্ছি না। আগের মতো এখন আর শ্রমিক নাই। যাও দুই-একজন পাই তারাও মজুরি অনেক বেশি চায়। এতো টাকা দিয়ে ধান কারানোর ক্ষমতা আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই নিজেই ছেলেকে নিয়ে একটু একটু করে কাটছি। বন্যা আর পানির ভয়ে আমাদের অবস্থা খারাপ।”
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “আমরা বাইর থেকে লেবার আনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়সহ পার্শ্ববর্তী জেলা, বিশেষ করে ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা এমনকি উত্তরবঙ্গেরও কিছু জেলায় চিঠি দিয়েছি। যাতে সেখান থেকে লেবার নিয়ে আসা হয়। পাশাপাশি এখানকার স্থানীয় লেবারের সরবরাহ বৃদ্ধি করার জন্য যে সমস্ত বালুমহল আছে বা পাথর ক্রেশিং মিল আছে সেগুলো নোটিশ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সেখানকার লেবার ধান কাটার জন্যে আসবে। পাশাপাশি আমরা স্থানীয়ভাবে যাতে আরো কিছু লেবার সংগ্রহ করা যায় সে চেষ্টা করছি। যেসব লেবার বিভিন্ন উপজেলায় কাজ করছে, বাইর থেকে আসছে তাদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে যেখানে শ্রমিক সংকট সেসব উপজেলার কৃষি কর্মকর্তাকে প্রদান করেছি।”
আপনার মতামত লিখুন :