Agaminews
Dr. Neem Hakim

সালমান শাহর মৃত্যুরহস্যের জট এবার কি সত্যিই খুলবে?


admin প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১২, ২০২৬, ১০:৫১ পূর্বাহ্ন /
সালমান শাহর মৃত্যুরহস্যের জট এবার কি সত্যিই খুলবে?

আহমেদ সাহিদ : ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকাই সিনেমার আকাশ থেকে ঝরে গেলে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মাত্র ২৪ বছর বয়সে চলে গেলেন জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, প্রায় তিন দশক পরও সেই প্রশ্নের পুরোপুরি উত্তর মেলেনি। তখন হয়েছিল মামলা। শুরুতে ছিল অপমৃত্যু, পরে পরিণত হয় হত্যা মামলায়। তবে সময়ের সঙ্গে একাধিকবার বদলে গেছে মামলার গতিপথ। বদলে গেছে তদন্তের ভাষা। আর এবার সেই পুরোনো রহস্যে যোগ হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি তারই ওই সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে (৫৪) সম্প্রতি গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সৌদি আরব যাওয়ার পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। ৪ আগস্ট গ্রেফতারের খবর প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় সেই প্রশ্ন, যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সালমান শাহর পরিবারকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় ৩০ বছর।

একসময় একই সিনেমার পর্দায় দেখা গেছে সালমান শাহ ও ডনকে। একজন ছিলেন নায়ক, অন্যজন খলনায়ক। সিনেমার গল্পে তাদের অবস্থান ছিল বিপরীত মেরুতে। কিন্তু বাস্তব জীবনে দুজনের মধ্যে ছিল পারিবারিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আর সেই ডনই দীর্ঘদিন ধরে সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি। শুধু তাই নয়, সালমানের মৃত্যুর পর তার কয়েকটি সিনেমায় নায়কের কণ্ঠও দিয়েছিলেন ডন। সালমানের কণ্ঠ নকল করার দক্ষতা ছিল তার। মৃত্যুর পর মুক্তি পাওয়া ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘সত্যের মৃত্যু নেই’সহ কয়েকটি সিনেমায় তার কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়। একজন মৃত নায়কের হয়ে পর্দায় কণ্ঠ দেওয়া সেই মানুষটিই তিন দশক পর তার মৃত্যুর জন্য অভিযুক্ত হয়ে গ্রেফতার হলেন। ঘটনার এ বৈপরীত্যই যেন সালমান শাহকে ঘিরে রহস্যের আরেকটি অধ্যায়।

* কীভাবে মামলায় এলো ডনের নাম

সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই নানা সময়ে তার মৃত্যুকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি হত্যামামলা হিসাবে আবার তদন্তের গতি পায়। এরপর রমনা থানায় করা মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হককে প্রধান আসামি এবং আশরাফুল হক ডনকে ৮ নম্বর আসামি করা হয়। মামলায় মোট ১১ জনের নাম রয়েছে। মামলার এজাহারে লেখা হয়, সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তবে আলোচিত এ মামলায় আসামি হওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ডনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক সত্যতা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

মামলায় নাম আসার পর ডন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। এমনকি সামিরা হকেরও কোনো দোষ নেই বলে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে জানিয়েছিলেন, পালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ তিনি দেখছেন না। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। দেশছাড়ার পথে বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেফতার করা হলো।

* কেন সৌদি যাচ্ছিলেন ডন

গ্রেফতারের ঘটনাকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ডন কেন সৌদি আরব যাচ্ছিলেন এবং তার বিদেশযাত্রা ঠেকানো গেল কীভাবে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালত সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডন ও সামিরা হকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। আদালতের এ আদেশের পর থেকে ডনকে আর জনসম্মুখে খুব একটা দেখা যায়নি। কয়েকমাস পার হতেই আদালতের আদেশকে তোয়াক্কা না করে ডন সৌদি যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন। এ ঘটনা তদন্তে নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। তিনি কীভাবে বিমানবন্দর পর্যন্ত গেলেন, তার বিরুদ্ধে থাকা নিষেধাজ্ঞা কীভাবে কার্যকর ছিল, তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং গ্রেফতারের পর তদন্তকারীরা তার কাছ থেকে কী জানতে চাইবেন, এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সামনে আসতে পারে।

* ১২ লাখ টাকার সেই অভিযোগ

সালমান শাহ হত্যা মামলাকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো, তাকে হত্যার জন্য ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। তবে এটি মামলার অভিযোগ বা তদন্তসংশ্লিষ্ট দাবি, আদালতে প্রমাণিত কোনো সত্য নয়। তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, এ দাবির পেছনে কী তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। কার সঙ্গে এই কথিত চুক্তি হয়েছিল? কীভাবে অর্থ লেনদেনের কথা বলা হচ্ছে? ঘটনার দিন ডনের অবস্থান কোথায় ছিল? কার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে তার কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ তদন্তকারীরা পেয়েছেন কি না? ডনের গ্রেফতারের পর এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ আরও বেড়েছে।

* তিন দশক পর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি

সালমান শাহ হত্যা মামলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘ ইতিহাস। মৃত্যু থেকে অপমৃত্যুর মামলা, তদন্ত, আদালতের নির্দেশ, নানা সাক্ষ্য ও বক্তব্য, এরপর হত্যা মামলা হিসাবে আবার তদন্ত। এতদিনের এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখন মামলার অন্যতম আলোচিত আসামি ডন পুলিশের হাতে। তার জিজ্ঞাসাবাদ থেকে নতুন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তদন্তকারীদের কাছে হয়তো প্রশ্ন থাকবে অনেক। সালমান শাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন ছিল? মৃত্যুর আগে ও পরে তার সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন? সালমানের মৃত্যুর দিন তিনি কোথায় ছিলেন? কোনো বৈঠক বা পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন কি না? তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো এতদিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেগুলোর পেছনে বাস্তব প্রমাণ কী?

* রহস্যের শেষ কোথায়?

সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে মানুষের আগ্রহের বড় কারণ, তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না। নব্বইয়ের দশকের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতীক। তার মৃত্যু তাই সাধারণ একটি মৃত্যুর ঘটনা হয়ে থাকেনি। প্রশ্ন থেকে গেছে। সন্দেহ থেকে গেছে। আর সেই সন্দেহের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আরও অনেক নাম। তখনকার প্রভাবশালী প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, চিত্রনায়িকা শাবনূর, স্ত্রী সামিরা প্রমুখ। মেকাপ আর্টিস্ট রুবি ও বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী রিজভী নামে এক ব্যক্তিও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এসবের মধ্যে আশরাফুল হক ডনের নামও ছিল অন্যতম। আজ সেই ডন পুলিশের হেফাজতে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। গ্রেফতারই শেষ কথা নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হতে পারে আরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে। তদন্ত বের করতে হবে সত্য। আর প্রায় ৩০ বছর ধরে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। স্বভাবতই তিন দশক পর আবারও পুরোনো সেই প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের জট কি এবার সত্যিই খুলবে? কীভাবে মারা গেলেন জনপ্রিয় এই নায়ক? ডনের গ্রেফতার সেই দরজা খুলে দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু দরজার ওপাশে কী আছে, সেটি জানার জন্য এখন অপেক্ষা তদন্তের ফলাফলের।

বিনোদন বিভাগের আরো খবর

আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর