Agaminews
Dr. Neem Hakim

মাদকাসক্তির নীরব বিষ থেকে উত্তরণের এখনই সময়


audhamyabangla প্রকাশের সময় : জুন ২৩, ২০২৬, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ / ১১
মাদকাসক্তির নীরব বিষ থেকে উত্তরণের এখনই সময়
  • -মোঃ মাসুদ মিয়া
  • একটি জাতির উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো সুস্থ, সচেতন ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। কিন্তু বর্তমানে ধূমপান, ই-সিগারেট (ভেপ), মাদক ও মদ্যপানের ক্রমবর্ধমান বিস্তার আমাদের সেই ভিত্তিকে নীরবে দুর্বল করে দিচ্ছে।বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এসব নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তা জনস্বাস্থ্য,সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। একসময় ধূমপানই ছিল নেশার
    প্রধান মাধ্যম, কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভেপ বা ই-সিগারেট নতুন রূপে তরুণদের আকৃষ্ট করছে।অনেকেই এটিকে আধুনিকতা, ফ্যাশন বা নিরাপদ বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে,ভেপও নিকোটিন আসক্তি তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যদিকে ইয়াবা,আইস, গাঁজা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার সমাজকে আরও জটিল সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
  • ধূমপান, ভেপ কিংবা মাদক- যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সবকিছুর পরিণতি একই। এগুলো মানুষেরশারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ধূমপানের কারণে প্রতি বছরঅসংখ্য মানুষ ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভপালমোনারি ডিজিজে আক্রান্ত হন। ধূমপানের সিগারেটে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও নিকোটিন ও ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে নিকোটিন স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাবফেলে। অন্যদিকে মাদকাসক্তি একজন মানুষকে ধীরে ধীরে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্তকরে দেয়। একসময় সে নিজের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য বোঝায় পরিণত হয়। এর চেয়েও ভয়াবহবিষয় হলো পরোক্ষ ধূমপান বা প্যাসিভ স্মোকিং। একজন ধূমপায়ী শুধু নিজের নয়, আশপাশের মানুষদেরও ক্ষতি করেন। পরিবারের শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা সহকর্মীরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিষাক্ত ধোঁয়া গ্রহণ করেন। ফলে তাদের মধ্যেও শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, হৃদরোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এটি গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেও মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
  • যুবসমাজের মধ্যে ধূমপান ও মাদক বিস্তারের অন্যতম কারণ হলো কৌতূহল, বন্ধুদের চাপ, সামাজিকযোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব, পারিবারিক অবহেলা, মানসিক চাপ, বেকারত্ব এবং সহজলভ্যতা।অনেক তরুণ মনে করেন, ধূমপান আধুনিকতার প্রতীক কিংবা মানসিক চাপ কমানোর উপায়। বাস্তবে এটিসম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। নিকোটিন সাময়িক স্বস্তির অনুভূতি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং মানসিক
    নির্ভরতা আরও বাড়িয়ে তোলে। পরে সেটিই নিকোটিনের আসক্তিতে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে আরও ভয়ংকর মাদকের দিকে নিয়ে যায়। ফলে একটি সাময়িক কৌতূহল শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারের স্বপ্ন ও একজন তরুণের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে।
  • ধূমপান ও মাদকের প্রভাব কেবল একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো পরিবার ও সমাজকে আক্রান্ত করে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, পড়াশোনাথেকে ঝরে পড়ে, চাকরি হারায় এবং পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। নেশার অর্থ জোগাতেঅনেকেই চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা, মাদক পাচার কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ফলে
    সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। একই সঙ্গে পরিবারে অশান্তি, দাম্পত্যকলহ, সহিংসতা এবং সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি হয়। একটি মানুষের আসক্তি ধীরে ধীরে একটিপরিবারের সুখ-শান্তি এবং সমাজের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।আজকের বাস্তবতায় সিগারেট, বিড়ি কিংবা জর্দা-গুলের পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে ই-সিগারেট বাভেপ। অনেক তরুণ এটিকে আধুনিকতা, ফ্যাশন কিংবা তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প মনে করলেও বাস্তবেএটি নিকোটিন আসক্তির নতুন ফাঁদ। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো ভেপ বা ই-সিগারেটের দ্রুতজনপ্রিয়তা। নানা রঙ, আকর্ষণীয় নকশা, সুগন্ধি ফ্লেভার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আড়ম্বরপূর্ণপ্রচারণার কারণে এটি তরুণদের কাছে একটি ফ্যাশন পণ্যে পরিণত হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু এতে প্রচলিত সিগারেটের মতো ধোঁয়া নেই, তাই এটি ক্ষতিকর নয়। বাস্তবে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
    অধিকাংশ ভেপে নিকোটিন থাকে, যা দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। এছাড়া এতে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক
    পদার্থ ফুসফুস ও হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। ফলে ভেপকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং
    এটি নতুন প্রজন্মকে নিকোটিনের দিকে আকৃষ্ট করার আরেকটি কৌশলে পরিণত হয়েছে।
  • বাংলাদেশ সরকার ধূমপান ও মাদক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ধূমপান ও
    তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ, সিগারেটের প্যাকেটে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা
    সংযোজন, তামাকপণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি এবং মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে সরকার
    সমস্যাটি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
    অভিযান, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং মাদকবিরোধী প্রচারণাও অব্যাহত রয়েছে। তবুও সীমান্ত দিয়ে
    মাদকের অবৈধ প্রবেশ, আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভেপের সহজলভ্যতা এবং
    সচেতনতার অভাবের কারণে সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও সম্ভব হয়নি।এই সংকট মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; প্রয়োজন সমাজের সব স্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ।পরিবারকে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের আচরণগত পরিবর্তনের দিকেনজর রাখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধূমপান, ভেপ ও মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক
    কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্তকরার মাধ্যমে তাদের ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেপ ও তামাকপণ্যের প্রচারণা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে,তাদের শুধু শাস্তি নয়; চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা
    স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও
    অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে ধূমপান ও মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালাতে হবে।
    ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
  • একই সঙ্গে তামাক ও ভেপপণ্যের বিপণন, প্রচার এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে
    কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে ধূমপান, ই-সিগারেট, মাদক ও মদ্যপানের বিরুদ্ধে
    সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,
    গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সর্বোপরি প্রতিটি সচেতন নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন
    করতে হবে। কারণ একজন মানুষের ধূমপান বা মাদকাসক্তি কখনোই শুধু তার ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এর
    প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি এবং পুরো রাষ্ট্রের ওপর। ধূমপান, ভেপ ও মাদক শুধু একটি স্বাস্থ্যগত
    সমস্যা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত একটি
    বড় সংকট। আজ যারা নেশার ফাঁদে পা দিচ্ছে, তারাই আগামী দিনের কর্মশক্তি, নেতৃত্ব এবং দেশের সম্পদ।
    তাই তাদের রক্ষা করা শুধু পরিবারের নয়, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর আইন প্রয়োগ,
    পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় ভূমিকা এবং সামাজিক প্রতিরোধ- এসবের সমন্বিত
    প্রয়োগের মাধ্যমেই এই নীরব মহামারি মোকাবিলা করা সম্ভব। একটি ধূমপানমুক্ত, মাদকমুক্ত, সুস্থ ও
    মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তখনই বাস্তবে রূপ নেবে, যখন প্রতিটি মানুষ উপলব্ধি করবে- স্বাস্থ্যই প্রকৃত
    সম্পদ, আর নেশামুক্ত জীবনই একটি সুন্দর পরিবার, শক্তিশালী সমাজ এবং উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণের সবচেয়ে
    বড় ভিত্তি।
  • লেখকঃ বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।

Uncategorized বিভাগের আরো খবর

আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর