Agaminews
Dr. Neem Hakim

ক্যাম্পে শৃঙ্খলা‌ মানছে না রোহিঙ্গারা, বাড়ছে উদ্বেগ


admin প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ /
ক্যাম্পে শৃঙ্খলা‌ মানছে না রোহিঙ্গারা, বাড়ছে উদ্বেগ


কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিয়ম না মানার প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি ক্যাম্পে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সাথে দুর্ব্যবহার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগ উঠেছে। রেশন বরাদ্দ কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অপরাধী চক্রের উস্কানিতে এই অস্থিরতা দিন দিন আরো বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ক্যাম্পের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মানতে অনীহা দেখাচ্ছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। বিশেষ করে রেশন কার্ড আপডেট, ঘর মেরামত বা জরুরি সেবার টোকেন সংগ্রহের সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায়ই তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা না পেয়ে তারা কর্মকর্তাদের হেনস্তা করার চেষ্টাও করছেন, যা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশৃঙ্খলার মূলে রেশন সংকট ও অসন্তোষ:

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ সহায়তা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সহায়তা তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ পাচ্ছেন মাসে ৭ ডলার, প্রায় ৩৩ শতাংশ পাচ্ছেন ১২ ডলার (বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩ ডলারসহ) এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে দেওয়া হচ্ছে ১০ ডলার করে। 

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কর্তৃক রোহিঙ্গাদের মাসিক রেশন বরাদ্দ হ্রাস করার পর থেকেই ক্যাম্পগুলোতে এক ধরনের হাহাকার ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই মানবিক সংকটকে পুঁজি করে একদল সুযোগ সন্ধানী রোহিঙ্গা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তুলছে। ফলে সামান্য অজুহাতেই তারা দলবদ্ধ হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। 

খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন ও শৃঙ্খলায় প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন ক্যাম্পবাসীরা।

কুতুপালং ৪ নম্বর বর্ধিত ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ কাইয়ুম বলেন, “মানুষ যখন না খেয়ে থাকে, তখন অনেকেই বাধ্য হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। এতে করে ক্যাম্পের ভেতরে চুরি-ডাকাতি ও নানা অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। দিন যত যাচ্ছে, মানুষের কষ্ট তত বাড়ছে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ক্যাম্পের ভেতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।”

রোহিঙ্গা নেতা হাফিজুর রহমান বলেন, “পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। মানুষ যখন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে না, তখন তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়।”

বেপরোয়া অপরাধী চক্র:

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া ২৬ নম্বর নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কমিউনিটি লিডার (মাঝি) আবুল কালাম বলেন, “কিছু কিছু বেপরোয়া অপরাধীর কারণে ক্যাম্পে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তারা কারো কথা শুনতে চায় না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেই যায়। তাদের বিচরণে দিন দিন পরিবেশ গুমোট হয়ে উঠছে। এমন অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করি। শান্তিতে বসবাস করতে চাই আমরা সাধারণ রোহিঙ্গারা। আশা করি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসন এগিয়ে আসবে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন ক্যাম্পের কয়েকজন ভলান্টিয়ার (স্বেচ্ছাসেবক) জানান, আগে রোহিঙ্গারা প্রশাসনের কথা শুনত, এখন অনেকেই কথা মানতে চায় না। সিআইসি (ক্যাম্প ইনচার্জ) অফিসের লোকজনের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করা যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উখিয়ার কুতুপালং (ক্যাম্প-১ ও ২) এবং বালুখালী (ক্যাম্প-৯ ও ১০) এলাকায় শৃঙ্খলার অভাব সবচেয়ে বেশি প্রকট। সম্প্রতি এসব ক্যাম্পের সিআইসি কার্যালয়ের সামনে রেশন কার্ডের ডিজিটাল এন্ট্রি এবং পরিবারের সদস্য সংখ্যা যাচাইয়ের সময় একদল রোহিঙ্গা উত্তেজিত হয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেও তাদের মধ্যে ভয়হীনভাবে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

কুতুপালং ১ নম্বর (ওয়েস্ট) ক্যাম্পের ডি/৮ ব্লকের রোহিঙ্গা নেতা হামিদ হোসেন বলেন, “রেশন কার্ডের এন্ট্রি নিয়ে কিছু মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে উত্তেজিত আচরণ করে। ক্যাম্পে যে সব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিরা নিয়ম-শৃঙ্খলা মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্য:

২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার সময় কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফের মানুষ মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাদের জন্য নিজেদের খাবার ভাগ করে দেওয়া থেকে শুরু করে বাড়িঘরের আঙিনায় জায়গা করে দেওয়ার মতো সহমর্মিতার নজির গড়ে ওঠে তখন। তবে, সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু রোহিঙ্গা চক্র অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নয়, ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারাও এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। টেকনাফ ও উখিয়ার মোট স্থানীয় জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ৬ লাখ, সেখানে ৩৩টি ক্যাম্পসহ আশপাশ এলাকায় প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যার এই বৈষম্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রোহিঙ্গা শিবির ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা সদস্যদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কিছু ডাকাতদলের উপস্থিতির কথাও জানা যায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, এসব গোষ্ঠীর একটি অংশ মাদক পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে সংঘর্ষও ঘটে থাকে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাকে কেন্দ্র করে অপহরণ একটি উদ্বেগজনক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অপরাধীরা অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। 

কাঁটাতারের বেড়া কেটে বাইরে যাতায়াত:

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া কেটে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যাতায়াতের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্যাম্পের বিভিন্ন অংশে বেআইনিভাবে দুই শতাধিক ছোট-বড় প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে অনেকেই নিয়ম ভেঙে ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অনিয়ন্ত্রিত পথ ব্যবহার করে কিছু রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং কেউ কেউ এলাকায় ঢুকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

শফিউল্লাহ কাটা ১৬ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মনির উল্লাহ ওরফে মনিয়া বলেন, “কাঁটাতারের বেড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অনেকেই বিকল্প পথ হিসেবে বেড়ার বিভিন্ন জায়গায় ফাঁক তৈরি করেছে।”

এদিকে, ক্যাম্পের বাইরে অনিয়ন্ত্রিত চলাচলকে দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তারা বলছেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরো বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ও আশপাশের এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযানে প্রায় ছয় শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এসব রোহিঙ্গা উখিয়ার বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পের বাইরে অবৈধভাবে বসবাস করে আসছিলেন। 

সেসময় সেনাবাহিনীর ৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর আহসানুল হাই সৌরভ জানিয়েছিলেন, ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে তাদের আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, “রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে ছড়িয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।” তিনি ক্যাম্প ত্যাগ নিয়ন্ত্রণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক ও মেরিন ড্রাইভ এলাকায় চেকপোস্ট সক্রিয় রেখে নজরদারি জোরদারেরও আহ্বান জানান তিনি।

পরিবেশ ও বনভূমি ধ্বংস:

এদিকে রাতের আঁধারে বনের কাঠ কাটা এবং কর্মকর্তাদের বাধা প্রদান করা এখন রোহিঙ্গাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ও তাদের প্রায় বাগবিতণ্ডা হয়। 

পালংখালী বনবিট কর্মকর্তা  বলেন, “ক্যাম্পসংলগ্ন বনাঞ্চলে রাতের আঁধারে কাঠ কাটার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। নিয়মিত টহল ও অভিযান চালিয়ে এসব কার্যক্রম ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও অনেক সময় দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়।” 

তিনি জানান, অবৈধভাবে বনসম্পদ আহরণ বন্ধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক বর্তমান পরিস্থিতি স্থানীয় জনগণের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” 

তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকটে স্থানীয়দের নিরাপত্তা, জীবিকা ও পরিবেশ- সবকিছুই চাপে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।” একইসাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা এবং টেকসই সমাধান হিসেবে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, “মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দেওয়া হলেও বর্তমান বাস্তবতায় ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” 

তিনি বলেন, “রেশন সংকট, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তা থেকে সৃষ্ট হতাশা অপরাধ প্রবণতা বাড়াচ্ছে। তাই শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং সচেতনতা বৃদ্ধি, মানবিক সহায়তা জোরদার এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।” স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

শরণার্থী অপরাধ বিষয়ক গবেষক রাফি আল ইমরান বলেন, “কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাস, সীমিত কর্মসংস্থান ও খাদ্য সংকটের কারণে সামাজিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। অপরাধবিজ্ঞানের স্ট্রেইন থিওরি অনুযায়ী, বৈধ উপায়ে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না হলে কিছু মানুষ অবৈধ পথে ঝুঁকে পড়ে- যার প্রতিফলন হিসেবে মাদক পাচার, অপহরণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ বাড়ছে।” 

তিনি বলেন, “মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রপথের সহজলভ্যতা অপরাধী চক্রকে সহায়তা করছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রহীনতা ও আইনি পরিচয়ের অভাব অনেকের মধ্যে আইনের ভয় কমিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী আইন প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।”

বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে টহল ও নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে এই অস্থিরতা আরও বড় সংঘাতের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (এডিআইজি) মোহাম্মদ কাউছার সিকদার বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অধিকাংশ সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই ঘটে। এসব বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এপিবিএন সদস্যরা সার্বক্ষণিক সজাগ থেকে দায়িত্ব পালন করছেন এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছেন।”

র‌্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক আ.ম. ফারুক বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাব নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, মাদক পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযানে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে নিরাপত্তা টহল বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না হয়। ক্যাম্পে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রেশন বিতরণসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে, যাতে রোহিঙ্গারা নিয়ম মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ হয়।”

তিনি আরো বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের টেকসই সমাধান হচ্ছে নিরাপদ প্রত্যাবাসন। এ লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।”





Source link

Uncategorized বিভাগের আরো খবর

আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর