
।। এবিএম ফজলুর রহমান।।
বৈশ্বয়িক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি নিয়ে দেশে যখন ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা সেই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে জ্বালানি ক্ষেত্রে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। দক্ষ জনবল দিয়ে সঠিক ব্যবহারে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান ঘটাতে পারে এই প্রকল্পটি। এটি বাস্তবায়ন হলে বৈশ্বয়িক চ্যালেঞ্চ মোকাবেলা করে ঘুরে দাড়াতে পারে বাংলাদেশ।কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে কাল ২৮ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (এনপিপি) ইউনিট-১-এ নতুন জ্বালানি লোডিং শুরু হবে।১৯৬১ সালে নেওয়া প্রকল্প দীর্ঘ চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে ৬৭ বছর পর বাস্তবের মুখ দেখছে। যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।জ্বালানি লোডিংয়ের তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে এবং ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানো হবে।বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রটি চালু হলে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট কমাতে সাহায্য করবে এবং ব্যয়বহুল আমদানিকৃত তরল জ্বালানির ওপর নিভর্রতা হ্রাস করবে বলে জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) ২০২৬ সালের গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে (বিএইসি) ইউনিট-১-এর লাইসেন্স প্রদান করে।জ্বালানি লোডিং হলো বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; যা নির্মাণ পর্যায় থেকে পরিচালন পর্যায়ে উত্তরণের ইঙ্গিত বহন করে।এই প্রক্রিয়ায় প্রথম ইউনিটে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টরে নতুন জ্বালানি লোড করা হয়। যা বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর আগের চুড়ান্ত ধাপ প্রথম তাপ উৎপাদন এবং নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশনসহ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথ প্রশস্ত করে থাকে।
বিশেজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক জ্বালানি হলো স্বল্প-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি ইউরেনিয়াম ডাইঅক্সাইড পেলেট। কয়লা বা তেলের মতো, এই পেলেটগুলো তাপ উৎপন্ন করে বিদ্যুৎ তৈরি করে। প্রতিটি পেলেটের ওজন প্রায় ৪.৫৫ গ্রাম, কিন্তু এটি প্রায় এক টন কয়লার সমতুল্য শক্তি উৎপাদন করতে পারে। একটি মাত্র জ্বালানি পেলেট শূন্য কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবারকে কয়েক মাস ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য যথেষ্ট।পেলেটগুলোকে ফুয়েল রড নামক জিরকোনিয়াম শংকর ধাতুর টিউবের মধ্যে রাখা হয়, যা তেজস্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। ফুয়েল রডগুলো প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন না হওয়া পর্যন্ত বেশ কয়েক বছর ধরে চুল্লির কেন্দ্রে থাকে।একত্রিত অ্যাসেম্বলিতে এই রডগুলো প্রায় ৪.৬ মিটার লম্বা হয় এবং প্রতিটিতে প্রায় ৫৩৪ কেজি জ্বালানি (স্বল্প-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ডাইঅক্সাইড) থাকে। ইস্পাত এবং জিরকোনিয়ামসহ প্রতিটি রডের ওজন প্রায় ৭৫০ কেজি এবং প্রতিটি অ্যাসেম্বলিতে এই ধরনের ৩১২টি রড থাকে।ইউনিট-১ এর রিয়্যাক্টর কোরে ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হবে, যা পানি দ্বারা শীতল করা হবে। ১৬৪টি অ্যাসেম্বলির প্রথম ব্যাচ (একটি অতিরিক্ত অ্যাসেম্বলি সহ) ২০২৩ সালের অক্টোবরে এসে পৌঁছায়, যা জ্বালানি লোডিংয়ের আগে পরিদর্শন এবং প্রস্তুতির সুযোগ করে দেয়।সাইটে জ্বালানি অ্যাসেম্বলিগুলোর আগেভাগে এসে পৌঁছানোর ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ পরিদর্শন পরিচালনা, কাঠামোগত অখন্ডতা যাচাই, গুণমান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা, নির্দিষ্ট অ্যাসেম্বলিগুলোর সাথে পরিচিত হওয়া, হ্যান্ডলিং ও লোডিংয়ের পদ্ধতি এবং কৌশল শেখা এবং অবশেষে রিয়াক্টরের প্রাথমিক জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য প্রস্ততি নিতে সক্ষম হন।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা প্রথম পারমাণবিক জ্বালানি লোডিংকে একটি নবনির্মিত রিয়্যাক্টরের কোরে জ্বালানি অ্যাসেম্বলিগুলোর প্রাথমিক স্থাপন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। এটি সেই মুহূর্তকে চিহ্নিত করে যখন একটি রিয়্যাক্টর নির্মাণ পর্যায় থেকে একটি কার্যকরী বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হয়। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে, কমিশনিং পরীক্ষাগুলোকে প্রধানত দুটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়: প্রাক-পরিচালনা এবং পরিচালনামূলক (পারমাণবিক পরীক্ষাসহ) পরীক্ষা। প্রাক-পরিচালনা পরীক্ষার মধ্যে কোনো জ্বালানি লোড করার আগে প্ল্যান্টের স্বতন্ত্র সরঞ্জাম, উপাদান এবং সিস্টেমগুলো পরীক্ষা করা অন্তর্ভুক্ত।
সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রাক-পরিচালনা পরীক্ষা সম্পন্ন, পর্যালোচনা এবং পরিচালনাকারী সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর এবং ছাড়পত্রের জন্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার পরেই কেবল জ্বালানি লোড করার অনুমতি দেওয়া হয়। নতুন জ্বালানির প্রথম লোডিং হলো কমিশনিং-এর পরবর্তী পর্যায়ের একটি অংশ, যার মধ্যে পারমাণবিক-সম্পর্কিত কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকে।একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লিতে প্রথম জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য পরিচালনামূলক প্রস্ততি হলো চুড়ান্ত নথিভুক্ত নিশ্চিতকরণ যে জনবল, পাওয়ার ইউনিটের সরঞ্জাম, কাঠামো, প্রক্রিয়া, কর্মসূচি, কার্যপ্রণালী, সুরক্ষা প্রোটোকল এবং সহায়ক অবকাঠামো ও সংস্থা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা পারমাণবিক জ্বালানি সন্নিবেশের জন্য প্রস্তুত।নিরাপত্তা, নকশা এবং নিয়ন্ত্রক মানদন্ড অনুসারে জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত প্ল্যান্ট সিস্টেমের নির্মাণ ও স্থাপন সম্পন্ন করা।
পারমাণবিক চালুকরণের জন্য প্রস্তুতি নিশ্চিত করে, সমস্ত প্রাক-পরিচালন (এ-পর্যায়) কমিশনিং পরীক্ষার সমাপ্তি এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এছাড়া, নভেম্বর ২০১৭-তে মূল অবকাঠামো নির্মাণ এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরে জ্বালানি হস্তান্তর সম্পন্ন হয়। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্রের মধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন ডাক, টেলিযোগাযোগ বিভাগ তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এমপি। স্বাগত বক্তব্য দেবেন তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রনালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। সম্মানিত অতিথি থাকবের ডাক, টেলিযোগাযোগ বিভাগ তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ আর্ন্তজাতিক পরমানু শক্তি সংস্থার চেয়ারম্যান রাফায়েল গ্রসি ও রসাটমের মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচভ।
লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব ও ২০২৫ সালের রাশিয়ার মস্কোতে অনুষ্ঠিত “ওয়ার্ল্ড অ্যাটোমেকি উইক” এ অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি সাংবাদিক।
আপনার মতামত লিখুন :