Agaminews
Dr. Neem Hakim

আর হয়তো দেখা পাওয়া যাবে না সেই টুকরো হলুদ কাগজে মোড়ানো বার্তা


audhamyabangla প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১১, ২০২৫, ৬:০২ অপরাহ্ণ / ৯৭৭
আর হয়তো দেখা পাওয়া যাবে না সেই টুকরো হলুদ কাগজে মোড়ানো বার্তা

 

বাঁধন হোসেন,  জামালপুর প্রতিনিধি
কারো ঠিকানায় কাগজে লেখা চিঠি আদান-প্রদানের ব্যাপারটি বেশ পুরনো হলেও এখন আর তেমনটি দেখা যায় না। প্রিয় পাঠক, শেষ কবে কাকে চিঠি লিখেছেন বা কারো কাছ থেকে চিঠি পেয়েছেন সেটি কি মনে পড়ে? আচ্ছা  এ প্রসঙ্গ বাদই দিলাম। কিন্তু চিঠির প্রসঙ্গ আসলেই মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠে এক টুকরো হলুদ কাগজে মোড়ানো বার্তা যার কেন্দ্র ডাকঘর। আজ কথা বলি ডাকঘর নিয়ে শুধুমাত্র চিঠি বা কোন জিনিস আদান-প্রদান করাই নয়, ডাকঘরগুলোর বহুমাত্রিক সেবা কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম মানিঅর্ডার। এক সময়ের টাকা পাঠানোর জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য এই মাধ্যমটির ব্যবহার এখন খুবই কমে গেছে। তবে সংখ্যায় খুব কম হলেও এখনো কেউ কেউ মানিঅর্ডারের মাধ্যমে সেই প্রাচীন প্রথাতেই করছেন টাকা লেনদেন। যদিও মানিঅর্ডারের পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আদলে দ্রুত সময়ে টাকা আদান-প্রদানের জন্য ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস) নামে বিকল্প সেবা চালু করেছে ডাক বিভাগ। তবে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত প্রচার না থাকায় জনপ্রিয়তা পাচ্ছেনা সার্ভিসটি। এক সময় শহর বা গ্রামের সবাই চিঠির পাশাপাশি মানিঅর্ডারের নামও ভালোভাবে জানত। দূরে থাকা পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়-স্বজনরা টাকা পাঠাত ডাকঘরের মাধ্যমে। মানিঅর্ডার ছিল তখন কাউকে টাকা পাঠানোর একমাত্র সহজ ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। ডাকঘরে গিয়ে মানিঅর্ডারের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে দুরত্ব অনুযায়ী সাধারণত এক দিন বা দুই দিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তি বিকশিত হওয়ায় ডাকঘরের মাধ্যমে চিঠি আদান-প্রদানের পাশাপাশি ব্যাপক মাত্রায় কমেছে মানিঅর্ডার। ডিজিটাল যুগে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারের ফলে ডাক বিভাগের এই ঐতিহ্যবাহী সেবা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ডাকঘরের কাউন্টারে আগের মতো মানিঅর্ডার পাঠানো বা গ্রহণ করার ভিড় এখন আর তেমনটি দেখা যায় না। বর্তমানে যে কেউ তার বাড়ির পাশের দোকান বা নিজের মোবাইল ফোন থেকে মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমে মুহুর্তেই টাকা পাঠাতে বা টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। এ কারণে বেশীরভাগ মানুষ মানিঅর্ডার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এক দশক আগেও প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা মানিঅর্ডারের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হতো। কিন্তু বর্তমানে ডাকঘরের এই সেবার ব্যবহার অনেকটাই কমেছে। জামালপুর শহরের বকুলতলায় জেলার প্রধান ডাকঘরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার প্রধান ডাকঘর ছাড়াও জামালপুরের ৭টি উপজেলা ডাকঘর, ১৫টি উপ ডাকঘর, ১টি নৈশ্য ডাকঘর, ৬টি অবিভাগীয় উপ ডাকঘর ও ১৮২টি শাখা ডাকঘরের মাধ্যমে পুরো জেলায় সেবা দিয়ে থাকে ডাক বিভাগ। আগে এসব সকল ডাকঘর থেকে মানিঅর্ডার আদান-প্রদান করা হতো। কিন্তু চাহিদা না থাকায় বর্তমানে জেলার প্রধান ডাকঘর, ৭টি উপজেলা ডাকঘর, ১৫টি উপ ডাকঘর ও একটি নৈশ্য ডাকঘর ব্যাতিত অন্যান্য সকল ডাকঘর থেকে মানিঅর্ডার সার্ভিসটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে করে মানিঅর্ডার কার্যক্রম আরও সংকুচিত হয়েছে। একই জেলার ভেতরে মানিঅর্ডারের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে সময় লাগে একদিন অর্থাৎ আগের দিন টাকা পাঠালে পরের দিন টাকা হাতে পেয়ে যায়। জামালপুর থেকে রাজধানী ঢাকায় মানিঅর্ডার পৌছায় একদিনেই, বিতরণ করা হয় পরের দিন। কিন্তু চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা বা অন্য কোন জেলায় মানিঅর্ডার করলে দূরত্ব অনুযায়ী টাকা পৌছাতে সময় লাগে দুই দিন থেকে সর্বোচ্চ ৫ দিন। আগে ট্রেনে করে ডাক পরিবহন করা হলেও ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়সহ নানা কারণে যথাসময়ে গন্তব্যে পৌছাতে দেরি হওয়ায় বর্তমানে নিজস্ব পরিবহনে ডাক পাঠাচ্ছে ডাক বিভাগ। এতে করে আগের চেয়ে এখন আরও দ্রুত সময়ে সেবা পাচ্ছেন গ্রাহকরা। মোবাইল ব্যাংকিং প্রথার প্রসার হওয়ায় ডাক বিভাগ দ্রুত সময়ে টাকা আদান-প্রদানের জন্য ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস) নামে বিকল্প সেবা চালু করেছে। এক্ষেত্রেও বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে ডাকঘরের কর্মঘন্টা। কারণ ডাকঘরের কার্যক্রম সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৫টায় শেষ হয়ে যায়। নৈশ ডাকঘরের কার্যক্রম বিকেল ৩টায় শুরু হয়ে রাত ৯টায় শেষ হয়। মানিঅর্ডার সার্ভিসের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগত লেনদেন নয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন করতে পারে। এদিকে, বিকেল থেকে মানুষ মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে বেশী মাত্রায় লেনদেন শুরু করে। তাই মোবাইল ব্যাংকিং এর চেয়ে মানিঅর্ডার বা ইএমটিএস সার্ভিসে টাকা আদান-প্রদানের খরচ কম হলেও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে পারছে না, বরং ধীরে ধীরে কমছে।
জামালপুর প্রধান ডাকঘর সূত্রে জানা যায়, এখনো কেউ কেউ মানিঅর্ডারের মাধ্যমে নিয়মিত টাকা আদান-প্রদান করছেন। মানিঅর্ডারে মূলত কাগজে-কলমে তথ্য-প্রমাণ থাকায় অনেকেই অর্থ লেনদেনে নির্ভরতা পান। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং এর মত মানিঅর্ডার সার্ভিসে কোন প্রকার প্রতারণা বা হয়রানির সুযোগ থাকেনা। এ কারণে, বিশেষ করে প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানগুলো মানিঅর্ডারের মাধ্যমে লেনদেন করে থাকে। তাছাড়া কবিরাজী ঔষুধ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ, বাড়ি ভাড়া পরিশোধ, বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে দাবীকৃত অর্থ পরিশোধসহ অন্যান্য কিছু লেনদেনে এখনো অনেকেই মানিঅর্ডার সার্ভিস ব্যবহার করছেন। সর্বনিম্ন ৫শ টাকা মানিঅর্ডার করতে খরচ হয় মাত্র ৫ টাকা। ১ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত পাঠাতে খরচ হয় মাত্র ১০ টাকা। ১০ হাজার টাকা পাঠাতে খরচ হয় মাত্র ৫০ টাকা। মানিঅর্ডারে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পাঠানো যায়, এতে খরচ হয় মাত্র ২শ ৫০ টাকা, যা যেকোন মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে টাকা পাঠানোর খরচের চেয়ে অনেক কম। জামালপুর জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারী মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মোট ৫০৬টি মানিঅর্ডার বিতরণ করা হয়েছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৪৩৪ টাকা। একই সময়ে ১ হাজার ৫৩৫টি মানিঅর্ডার অন্যত্র ইস্যু করা হয়েছে। যার পরিমাণ ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৭ টাকা। যা থেকে ডাক বিভাগ কমিশন আদায় করেছে মাত্র ১৬ হাজার ২৯৮ টাকা। এদিকে, চলতি বছরের জানুয়ারী মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মোট ৫৫ গ্রাহককে ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস) এর মাধ্যমে টাকা বিতরণ করা হয়েছে। যার পরিমাণ ১০ লাখ ১৯ হাজার ১১০ টাকা। ইএমটিএস অন্যত্র ইস্যু করা হয়েছে মোট ৯৫টি, যার পরিমাণ ৪ লাখ ৩১ হাজার ৩৯৪ টাকা। সেখান থেকে ডাক বিভাগের কমিশন আদায় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৯৫ টাকা।
মাদারগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা শাওরিন রহমান (৫৫) জানান, আমি জামালপুর থেকে পড়াশোনা করতাম আমার বাবা তখন আমাকে বাড়ি থেকে মানিঅর্ডারের মাধ্যমে টাকা পাঠাতেন। এখন আমি একটি স্কুলে চাকরি করি, গ্রামে বাবা-মায়ের কাছে প্রতি মাসেই টাকা পাঠাতে হয়। আমি কিছুদিন মানিঅর্ডারে মাধ্যমে বাড়িতে টাকা পাঠিয়েছি। এখন বাড়ির কাছের দোকান থেকে যখন তখন মোবাইলেই টাকা পাঠানো যায়, আবার টাকা তোলাও যায়। তাই এখন আর ডাকঘরে মানিঅর্ডার করতে যাই না। জামালপুর প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আবদুর রশিদ বলেন, মানিঅর্ডারে টাকা পাঠানোর বিষয়ে মানুষকে আগ্রহী করতে সরকারি প্রচারমাধ্যমে বেশী বেশী প্রচার করা হলে জনপ্রিয়তা পাবে। তবে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেলায়, সভা-সেমিনারে ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা মানিঅর্ডারে সাশ্রয়ে, নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে টাকা আদান-প্রদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকি। এখানে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য।জামালপুর ডাক বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল  আব্দুল হামিদ জানান, মানিঅর্ডার বিষয়টি অনেক আবেগের। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোন প্রতিযোগীতা নেই। দেশের মানুষকে সেবা প্রদানের জন্যই মানিঅর্ডার সার্ভিসটি সচল রাখা হয়েছে, রয়েছে বিকল্প ইএমটিএস সার্ভিস। যারা আগে থেকেই মানিঅর্ডার ব্যবহার করেন ও মোবাইল ব্যবহারে দক্ষ নয়, তারা এখনো মানিঅর্ডারের উপর নির্ভরশীল।  একসময় প্রতিদিনই কয়েকশ মানিঅর্ডার পাঠানো ও গ্রহণ করা হতো। এখন দিনে মাত্র কয়েকটি মানিঅর্ডার আসে। ডাকঘরে এসে কাগজে-কলমে প্রক্রিয়া অনুযায়ী মানিঅর্ডার করতে হয়, যা মোবাইল ব্যাংকিং এর চেয়ে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ কারণে বাড়ছে মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমে লেনদেন। ডাক বিভাগের সেবাকে আধুনিকায়ন করে মানিঅর্ডার সার্ভিসকে এজেন্সির মাধ্যমে ২৪ ঘন্টা পরিচালনা করতে পারলে ডিজিটাল মডেলে এটি আবার জনপ্রিয়তা পেতে পারে।

2 Attachments • Scanned by Gmail

Uncategorized বিভাগের আরো খবর

আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর